হিন্দু মায়ের মুখাগ্নি মুসলমান ‘পুত্রের’ হাতে

904

রাঙ্গালিবাজনা : গর্ভের সন্তান  ননীকে আর  খুঁজে পেলেন না কুমোদেবী। তাঁর মুখাগ্নিও তাই হল না ননীর  হাতে। তবে, রবিবার  ‘কুড়িয়ে পাওয়া’ হিন্দু  মায়ের মুখাগ্নি করলেন কুমোদেবীর মুসলমান ছেলে সাজু তালুকদার। তাঁর শেষকৃত্যটা আদিবাসী রীতি মেনেই সম্পন্ন হল রবিবার। মুখাগ্নির পর প্রয়াত কুমোদেবীর দেহকে কবরস্থ করা হল রবিবার।

আলিপুরদুয়ার জেলার বীরপাড়া থানার ডিমডিমা চা বাগান এলাকার বাসিন্দা গাড়িচালক সাজু তালুকদারের পরিচালিত হেভেন শেল্টার হোমের আবাসিক ছিলেন ৯০ পেরনো কুমোদেবী  ভুগছিলেন বার্ধক্যজনিত রোগে।  মাস আটেক আগে ইসলামপুরের রাস্তায় পড়ে ছিলেন ওই বৃদ্ধা । তারপর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হাত ধরে  তাঁর ঠাঁই হয়  হেভেন শেল্টার হোমে। কিন্তু ঘরের ঠিকানাই  ভুলে গিয়েছিলেন  কুমোদেবী। মাঝে মাঝে ”ননী ননী” বলে ডেকে কেঁদে উঠতেন তিনি। ননী নাকি তাঁর ছেলের নাম। ঠিকানা জানতে না পারায় তাঁকে ঘরে ফেরাতে পারেননি সাজুবাবুও। শনিবার তিনি মারা যান। রবিবার তাঁর মুখাগ্নি করেন সাজু তালুকদার।

- Advertisement -

ডিমডিমা চা বাগানের অদূরে ডিমডিমা নদীর তীরে অবস্থিত সাজু তালুকদারের আশ্রয়গৃহটি। এতদিন ১৬ জন আবাসিক ছিলেন সেখানে। কাউকে রাস্তা থেকে তুলে এনে ঠাই দিয়েছেন সাজুবাবু‌। কেউ আবার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হাত ধরে ঠাঁই পেয়েছেন। কয়েকজন আবাসিকের ঠিকানা খুঁজে পাওয়ায় তাঁদের পরিবারের কাছে ফেরাতে পেরেছেন সাজু তালুকদার। কিন্তু, অনেক আবাসিকই নিজের ঠিকানা ভুলে গিয়েছেন। কারও কারও আবার পরিবার পরিজনই নেই। কুমোদেবীর প্রয়াণের পর আবাসিকদের সংখ্যা কমে হল ১৫।

হেভেন শেল্টার হোমের আবাসিকদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র নিয়ে আসেন অনেকেই। কেউ কেউ সেখানে গিয়ে পালন করেন সন্তানের জন্মদিন কিংবা বিবাহবার্ষিকী। পুজো, ঈদেও অনেকে মিষ্টি নিয়ে ছোটেন হেভেন শেল্টার হোমে। পুজো এবং ঈদের মতো পরবের দিনগুলিতে সেখানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন সাজুবাবু।

ইসলাম ধর্মাবলম্বী হয়েও হিন্দু রীতিতে মুখাগ্নি প্রসঙ্গে সাজুবাবু বলেন, ‘মানবধর্মই সবচেয়ে বড়ো ধর্ম বলে মনে করি। ছেলেদের হাতে মুখাগ্নি মায়ের অধিকার। তাই ধর্ম জাতপাতের ভেদাভেদের বাইরে এসে মায়ের আশা পূরণ করার চেষ্টা করেছি। কারণ, কুমোদেবীকে এতদিন মায়ের মতোই দেখেছি। আশ্রয়গৃহটি আদিবাসী এলাকায় অবস্থিত। শেষকৃত্যে এসেছিলেন সংলগ্ন ডাঙ্গাপাড়া এলাকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন। আদিবাসী সম্প্রদায়ের অনেকেই মৃতদেহ কবরস্থ করেন। তাই আদিবাসী রীতি মেনেই সম্পন্ন করা হয়েছে শেষকৃত্য।’

এদিন ডাঙ্গাপাড়ার বাসিন্দা সোমরা মুন্ডা, দাহারু মুন্ডা, জাতরু মুন্ডাদের সঙ্গে কুমোদেবীর দেহ কাঁধে তুলে নেন সাজু তালুকদার। জাতরু, দাহারুর কণ্ঠে রামনাম, সাজু তালুকদারের হাতে কুমোদেবীর মুখাগ্নিতে রবিবার যেন ক্ষণিকের জন্য  ভেঙে খানখান হয়ে গেল ধর্ম আর জাতপাতের সংকীর্ণ বেড়াজাল।

ছবি- কুমোদেবীর দেহ কাঁধে নিয়ে শেষকৃত্যে চলেছেন সাজু তালুকদার।

তথ্য ও ছবি – মোস্তাক মোরশেদ হোসেন