উত্তরেও প্রতারণার জাল বিছিয়েছিলেন দেবাঞ্জন

60

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : শুধু খাস কলকাতা নয়, ভুয়ো আইএএস দেবাঞ্জন দেব প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিলেন উত্তরবঙ্গেও। মুখ্যমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে শিলিগুড়ির মৈনাক পর্যটন আবাসে দিনের পর দিন বৈঠক করেছেন দেবাঞ্জন। মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ কোর কমিটির সদস্য করিয়ে দেওয়ার নামে বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে মোটা টাকা হাতিয়েছেন। জিটিএ এবং চা বাগান প্রকল্পের ৫০০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে একাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকেও লক্ষ-লক্ষ টাকা তুলেছেন জাল ভ্যাকসিন কাণ্ডের নায়ক। ২০১৬ সাল থেকে নিয়মিত শিলিগুড়িতে আসতেন ওই প্রতারক। ঘুরতেন নীল বাতি লাগানো গাড়ি নিয়ে। দেবাঞ্জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এমনই সব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানতে পেরেছে কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল।

দেবাঞ্জনের উত্তরবঙ্গের যোগসূত্র হিসাবে উঠে এসেছে জনৈক সৌভিক মজুমদারের নাম। কে এই সৌভিক মজুমদার? উত্তরবঙ্গ সংবাদের অন্তর্তদন্তে উঠে এসেছে সৌভিক-দেবাঞ্জনের ঘনিষ্ঠতার একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের নিউ পালপাড়ার বাসিন্দা সৌভিক বাড়ির পাশেই একটি ছোট খাবারের দোকান চালান। পাশাপাশি গানও লেখেন তিনি। সেই গান লেখার সূত্রেই ২০১৫ সাল নাগাদ কলকাতায় দেবাঞ্জনের সঙ্গে পরিচয় হয় সৌভিকের। ধীরে ধীরে বাড়ে ঘনিষ্ঠতা। ঘনিষ্ঠতা এতটাই ছিল য়ে একে অপরকে তুমি বলে সম্বোধন করতেন দেবাঞ্জন ও সৌভিক। সৌভিককে দাদা বলেই ডাকতেন দেবাঞ্জন। শুধু তাই নয়, দেবাঞ্জনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল তৃণমূলের আইনজীবী সেলের সহ সভাপতি অত্রি শর্মারও।

- Advertisement -

যতবারই দেবাঞ্জন শিলিগুড়িতে এসেছিলেন ততবারই তাঁর সঙ্গী ছিলেন সৌভিক। সৌভিকের সঙ্গে কালিম্পং সহ একাধিক জায়গাতেও গিয়েছিলেন দেবাঞ্জন। তরাই ও ডুয়ার্সের বেশ কয়েকটি চা বাগানে গিয়ে আইএএস পরিচয় দিয়ে বাগান সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। জিটিএতে ৫০০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার টোপ দিয়ে দার্জিলিং মোড়ের একটি হোটেল এবং মৈনাক পর্যটন আবাসে শিলিগুড়ির কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গেও দফায় দফায় বৈঠক করেছিলেন। পরবর্তীতে সেই ঠিকাদারদের কলকাতার সল্টলেকের একটি অফিসে ডেকে নিয়ে গিয়ে আলোচনা করেন ওই প্রতারক। সূত্রের খবর, কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য কমিশন হিসাবে ঠিকাদারদের কাছ থেকে বেশ কয়েক লক্ষ টাকাও আদায় করেছিলেন দেবাঞ্জন।

কলকাতার বৈঠক শেষে ২০১৮ সালের শেষের দিকে ফের একবার শিলিগুড়িতে এসেছিলেন ওই ভুয়ো আইএএস। এসেই ঠিকাদারদের ফের বৈঠকে ডেকেছিলেন। সেই সময় ঠিকাদাররা শিলিগুড়ির বিশিষ্ট আইনজীবী অত্রি শর্মাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। দেবাঞ্জনের সঙ্গে বৈঠকের কথা স্বীকার করেছেন অত্রি শর্মা। তিনি জানিয়েছেন, সৌভিকের উপস্থিতিতেই দার্জিলিং মোড়ের একটি হোটেলে বৈঠক হয়। বৈঠকে চলাকালীন দেবাঞ্জনের কথামতো প্রায় এক লক্ষ টাকা দামের একটি আইফোন এক ঠিকাদার কলকাতার একটি ঠিকানায় পাঠানোর বন্দোবস্ত করেছিলেন। সেই সময়ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে বেশ কয়েক লক্ষ টাকা নিয়েছিলেন দেবাঞ্জন।

অত্রি বলেন, আমাকে দেবাঞ্জন বলেছিল, মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গের জন্য একটি বিশেষ কোর কমিটি করতে চান। তার অফিস হবে সল্টলেকে। মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরের হয়ে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের গোটা বিষয়টি দেখভাল করতে হবে। চা বাগানের যাবতীয় দাযিত্ব থাকবে কমিটির উপর। আমাকে কমিটির চেয়ারম্যান করারও প্রস্তাব দেয়। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কথাও বলে। প্রথমে বিশ্বাস করলেও ওর একের পর এক বড় বড় কথা শুনে সন্দেহ হওয়ায় পরে আমি উৎসাহ দেখাইনি। ঠিকাদারদের বলেছিলাম, ব্যবসার বিষয়ে বুঝেশুনে এগোতে। পরে ঠিকাদাররাও সেভাবে যোগাযোগ রাখেননি।

গোটা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত দাবি করেছেন অত্রি। যদিও বৈঠকে যে সব ঠিকাদাররা ছিলেন তাঁদের কেউই বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না। তাঁর সঙ্গে দেবাঞ্জনের ঘনিষ্ঠতার কথা স্বীকার করে নিলেও ঠিকাদারদের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা মানতে চাইছেন না সৌভিক। তাঁর দাবি, দুটি গান লেখানোর জন্যই প্রথমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন দেবাঞ্জন। পরবর্তীতে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। তবে টাকা লেনদেনের ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। বাবার চিকিৎসার প্রয়োজনে দেবাঞ্জন তাঁর কাছ থেকে প্রায় তিন লক্ষ টাকা ধার নিয়েছিল বলেও জানিয়েছেন সৌভিক।

তিনি বলেন, দেবাঞ্জন নীল বাতির গাড়ি নিয়ে ঘুরত। তবে সঙ্গে কোনও নিরাপত্তারক্ষী দেখিনি। শিলিগুড়িতে এলে মৈনাকেই উঠত। নিজেকে আইএএস পরিচয় দিত। ওর সঙ্গে পাহাড়, তরাই, ডুয়ার্সের অনেক জায়গাতেই গিয়েছি। তবে আচরণে কখনও সন্দেহ হয়নি যে প্রতারক। আমি কলকাতা গেলে দেখাও করতাম। দীর্ঘদিনের পরিচয়। পুলিশ তদন্তে ডাকলে সবরকম সহযোগিতা করতে রাজি আছি। সূত্রের খবর, দেবাঞ্জনের উত্তরবঙ্গ যোগের তদন্তে শিলিগুড়িতে আসতে পারে কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল। শিলিগুড়ি পুলিশের কোনও আধিকারিক এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।