বংশীবদনের রাজবংশী স্কুলে বিতর্ক

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : এখনও কোনও পাঠ্যসূচি তৈরি হয়নি, কোনও পাঠ্যপুস্তকও নেই। হরফ বা শব্দভাণ্ডার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা কোনও সরকারি অনুমোদন ছাড়াই একুশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে হঠাৎ করেই উত্তরবঙ্গজুড়ে তৈরি হয়ে গিয়েছে প্রায় ২০০টি রাজবংশী স্কুল। গত এক মাসে কোচবিহার থেকে মালদার বিভিন্ন এলাকায় স্কুলগুলি তৈরি করা হয়েছে।

গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশন (জিসিপিএ)-এর সম্পাদক বংশীবদন বর্মনের দাবি, সাংগঠনিকভাবে স্কুলগুলি তাঁরাই চালু করেছেন। জিসিপির সম্পাদক হওয়ার পাশাপাশি বংশীবদনবাবু রাজবংশী ভাষা আকাদেমি এবং রাজবংশী উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক পর্ষদ দুই সরকারি সংস্থার চেয়ারম্যান পদেও রয়েছেন। তাঁর উদ্যোগে স্কুল চালু হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের ধারণা হয়েছে স্কুলগুলি সরকারি উদ্যোগেই তৈরি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই এমনও প্রচার শুরু হয়েছে যে, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই রাজ্য সরকারি স্কুল হিসাবে চলবে এই রাজবংশী স্কুলগুলি। ফলে স্কুলগুলিতে শিক্ষক নিযোগ নিয়ে রাজবংশী যুবসমাজে শোরগোল পড়েছে। অন্যদিকে, এই স্কুল নিয়ে এখন জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে। বিজেপির অভিযোগ, ভোটের আগে রাজবংশী সম্প্রদায়কে ভুল বোঝাতেই স্কুলের নামে ভাঁওতা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগের নামে বেকার যুবক-যুবতীদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা তোলার অভিযোগও তুলেছেন বঙ্গ বিজেপির নেতারা। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বংশীবদনবাবু।

- Advertisement -

সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই কোচবিহারে ৫০, আলিপুরদুয়ারে ২৫, জলপাইগুড়িতে ৪০, উত্তর দিনাজপুরে ৪৫, দক্ষিণ দিনাজপুরে ২০, দার্জিলিং এবং মালদায় ১০টি স্কুল খোলা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমিতে কাঠ, টিন দিয়ে স্কুলঘর তৈরি হয়েছে। করোনার কারণে সরকারি প্রাথমিক স্কুল বন্ধ থাকলেও নির্দেশিকা অমান্য করে কোভিড প্রোটোকল ভেঙে পড়ুয়াদের ডেকে এনে রাজবংশী স্কুলগুলিতে পড়ানো হচ্ছে। সরকারি প্রাথমিক স্কুলে যেসব পাঠ্যপুস্তক পড়ানো হয় সেই সবই পড়ানো হচ্ছে রাজবংশী স্কুলগুলিতে। রাজ্য শিক্ষা দপ্তরের সচিব পর্যায়ের এক আধিকারিক বলেন, এখনও পর্যন্ত রাজবংশী স্কুল তৈরির কোনওরকম নির্দেশিকা রাজ্য সরকারের তরফে দেওয়া হয়নি। বেসরকারি উদ্যোগে স্কুল তৈরির জন্যও সুনির্দিষ্ট সরকারি প্রক্রিয়া মেনে অনুমোদন নিতে হয়। কোথাও যদি রাজবংশী স্কুলের নামে স্কুল তৈরি করে নিয়োগ করা হয়ে থাকে তাহলে সবটাই বেআইনি।

তবে বংশীবদনবাবু বলেন, আমরা সাংগঠনিকভাবে ২০০টি স্কুল শুরু করেছি। মুখ্যমন্ত্রীকেও অনুরোধ করেছি যাতে স্কুলগুলিকে মান্যতা দেওয়া যায়। তবে এখন পর্যন্ত কোনও অনুমোদন মেলেনি। মুখ্যমন্ত্রী আমাদের দাবি খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ করার আশ্বাস দিয়েছেন। রাজবংশী ভাষা আকাদেমির তরফেও কিছু স্কুল আমরা ঘুরে দেখেছি। প্রতি স্কুলে গড়ে চারজন করে শিক্ষক কাজ শুরু করেছেন। সবটাই হচ্ছে রাজবংশী ভাষার উন্নয়নের জন্য। এটা নিয়ে অযথাই বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, ওই ধরনের স্কুল তৈরির কথা আমার কানেও এসেছে। কিন্তু কীভাবে স্কুলগুলি তৈরি হল সেটা বোধগম্য হয়নি। রাজবংশী ভাষায় স্কুল তৈরির বিষয়টি খানিকটা জটিল। তার জন্য পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যসূচি, পাঠ্যপুস্তক দরকার। রাজবংশী ভাষার উন্নয়নে সেইসব তৈরির কাজ চলছে। তারজন্য আরও কিছুটা সময় লাগবে। হঠাৎ করে স্কুল চালু করে দেওয়া সম্ভব নয়।

কোচবিহারের দিনহাটা মহকুমার বড়শাকদল গ্রাম পঞ্চায়েতের কুচনি এলাকায় একটি রাজবংশী স্কুল চালানো হচ্ছে। সেই স্কুলের এক শিক্ষক দীপঙ্কর বর্মন বলেন, বংশীবদন বর্মনের নির্দেশেই স্কুল শুরু করেছি আমরা। আমাদের বায়োডেটা জমা নেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে জানুয়ারিতেই স্কুল সরকারি অনুমোদন পাবে। তাই আপাতত আমরা সরকারি প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়াদেরই ডেকে এনে পড়াচ্ছি। বংশীবদন বর্মনের সঙ্গে তৃণমূলের সুসম্পর্ক রয়েছে। তৃণমূলের টিকিটে কোচবিহারের কোনও একটি আসনে তিনি লড়তে পারেন তেমন আলোচনাও শোনা যাচ্ছে তৃণমূলের অন্দরে। এই পরিস্থিতিতে উত্তরবঙ্গজুড়ে ২০০টি রাজবংশী স্কুল তৈরির পিছনে রাজনৈতিক অভিসন্ধি রয়েছে বলেই মনে করছেন বিজেপি ও বাম শিবিরের নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, রাজবংশী ভোটব্যাংক ধরে রাখতেই ভোটের আগে রাজবংশী স্কুলের টোপ দেওয়া হচ্ছে।

বিজেপির রাজ্য সহ সভাপতি প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, রাজবংশী ভোটাররা পাশ থেকে সরে গিয়েছেন বুঝতে পেরেই ভোটের আগে তৃণমূলের পরিকল্পনাতেই তাদের শাগরেদ বংশীবদন রাজবংশী স্কুলের নামে নতুন ভাঁওতা শুরু করেছেন। রাজবংশী বেকার যুবক-যুবতীদের ভুল বুঝিয়ে মিথ্যা কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা তোলা হচ্ছে। আমরা এই প্রতারণার ফাঁদ সম্পর্কে রাজবংশী সম্প্রদায়ে মানুষকে বোঝাব। কোভিড প্রোটোকল ভেঙে প্রাথমিকের পড়ুয়াদের একত্রিত করার অপরাধে রাজ্য সরকারের আইনি পদক্ষেপ করা উচিত।