কোভিড চিকিৎসায় সিটি স্ক্যান, ভালো না খারাপ?

119

রোগীর শরীরে করোনার হালকা উপসর্গ রয়েছে ঠিকই, কিন্তু আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করতে সমস্যা হলে বা রিপোর্ট পেতে দেরি হলে অথবা রিপোর্ট নেগেটিভ এলেও চিকিৎসকরা অনেক সময় সিটি স্ক্যান করার পরামর্শ দিচ্ছেন। আর এতেই বিপত্তি, বলছেন অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্স (এইমস)-এর ডিরেক্টর ডাঃ রণদীপ গুলেরিয়া। তাঁর দাবি, কথায় কথায় এভাবে সিটি স্ক্যান করে আদতে বিপদ ডেকে আনা হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ওই রোগীর ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যাবে। সাম্প্রতিককালে এইমস ডিরেক্টরের এই মন্তব্য ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। ইন্ডিয়ান রেডিওলজিক্যাল অ্যান্ড ইমেজিং অ্যাসোসিয়েশন (আইআরআইএ) আবার এইমস ডিরেক্টরের মন্তব্যের সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছে।

হালকা উপসর্গ থাকলে সিটি স্ক্যান করে বুকে সংক্রমণ রয়েছে কি না, সেটা দেখার কোনও প্রয়োজন নেই। কিন্তু আরটি-পিসিআর রিপোর্ট পেতে দেরি হচ্ছে বা টেস্ট করানো যাচ্ছে না বলে অনেকেই চট করে সিটি স্ক্যান করার পরামর্শ দিচ্ছেন। রোগীরা সিটি স্ক্যান করছেনও। এর জেরে ওই রোগী নিজের শরীরে ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনছেন। ভবিষ্যতে ওই রোগীর ক্যানসারের ঝুঁকিও অনেকটাই বেড়ে যাচ্ছে। একবার সিটি স্ক্যান করা অন্তত ৩০০ বার এক্সরে করার সমান। সিটি স্ক্যান যেহেতু কিছুটা বিকিরণ ঘটায়, তাই এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেই যায়। তাই কোভিডে উপসর্গহীন বা হালকা উপসর্গ থাকলেও সিটি স্ক্যান না করাই ভালো।
রণদীপ গুলেরিয়া, ডিরেক্টর, এইমস

- Advertisement -

সিটি স্ক্যান করিয়ে হালকা, মাঝারি না গুরুতর, শরীরে কোন পর্যায়ে করোনার সংক্রমণ পাওয়া যাবে? আপনি যদি কোভিড পজিটিভ হয়ে থাকেন এবং পালস অক্সিমিটারে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ভালো দেখায় এবং কোনও উপসর্গ না থাকে তাহলে সিটি স্ক্যানে হালকা নিউমোনিয়া দেখাবে। এটা কি আপনার চিকিৎসার কাজে সহায়ক হবে? প্রতিটি সিটি স্ক্যান সেন্টারে দিনে ৫০-১০০টি করে পরীক্ষা করা হয়। সেখানে রোগীর পাশাপাশি পরিবারের লোকজন, টেকনিসিয়ান, নার্স সবাই থাকেন। ফলে সেখানেও সবাই সংক্রামিত হতে পারেন।
ডাঃ শমীক বসু, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ

আমরা সকলেই কমবেশি বিকিরণের শিকার। আমরা বাড়িতে থেকে দোকান, বাজার, অফিস করে প্রতি বছর ৩ মিলি সিভার্ট বিকিরণের সংস্পর্শে আসি। সূর্যরশ্মি, মহাজাগতিক রশ্মি, মাটি, পাথর, বাড়ি তৈরির উপাদান সবই এই বিকিরণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উৎস। ৫ ঘণ্টার বেশি আকাশপথে ভ্রমণ করলে আরও বেশি ক্ষতিকর বিকিরণের মুখে পড়তে হয়। কেন-না বিমানযাত্রায় আমরা মহাজাগতিক রশ্মির আরও কাছে চলে যাই।
যখন নেগেটিভ আরটি-পিসিআর কোনও সংক্রমণ ধরতে পারে না এবং রোগীর অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে, তখন একমাত্র ভরসা সিটি স্ক্যান। তবে ক্যানসারের কারণ হিসাবে সিটি স্ক্যানকে দায়ী করা একেবারেই অনুচিত। সাম্প্রতিক অতীতে ব্রেস্ট ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়তে জীবনদায়ী পরীক্ষা ম্যামোগ্রাফি সম্পর্কেও এমন ভ্রান্তিমূলক গুজব রটেছিল। তবে শুধুমাত্র নাক দিয়ে একটু জল ঝরছে, সামান্য জ্বর রয়েছে বলেই সিটি স্ক্যান করাতে দৌড়ানো ঠিক নয় বা আরটি-পিসিআর রিপোর্ট পেতে দেরি হচ্ছে বলেই আর্থিক সংগতি থাকায় ৫০০০ টাকা খরচ করে সিটি স্ক্যান করার তোড়জোড়ও নিতান্তই বোকামি। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, এইমস বা অন্য কোনও সরকারি মেডিকেল সংস্থার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যখন বক্তব্য পেশ করেন, তার সঙ্গে নানাবিধ সামাজিক, অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকে। এখন যখন সাংঘাতিক অসুস্থ একজন রোগী শয্যা পেতে নাজেহাল হচ্ছেন, সেখানে ডাক্তারবাবু করোনা রয়েছে কি না জানতে সিটি স্ক্যান করার পরামর্শ দিলে কী সাংঘাতিক অবস্থা হবে ভাবুন। সুতরাং এসব বিতর্কে নাজেহাল না হয়ে আসুন আমরা সবাই দায়িত্বশীল নাগরিকের মতো মাস্ক পরি আর শারীরিক দূরত্ববিধি মেনে চলি।
ডাঃ মানস চক্রবর্তী, গাইনিকলজিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট