রাজশ্রী প্রসাদ, পুরাতন মালদা : আমায় ভাসাইলি রে, আমায় ডুবাইলি রে…. মনে আছে পদ্মানদীর মাঝি ছবির অমর সেই গান। নদীমাতৃক বাংলার মৎস্যজীবীদের দৈনিক রোজনামচার খণ্ডচিত্র এই ছবি। ছবির বাস্তবতা এখন নজরে পড়বে পুরাতন মালদার মহানন্দা পাড়ের জেলেপাড়াগুলিতে। ছবির মতো বাস্তবেও নদী এখানে গড়ছে, ভাঙছে ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষা। মহানন্দা এবার বড়ো কৃপণ। তাই পুজোর আগে মন ভার জেলেপাড়ার।

একপাশে ইংরেজবাজার, আরেক পাশে পুরাতন মালদা। মাঝে দুই শহরের লাইফলাইন মহানন্দা। এক সময় আক্ষরিক অর্থেই এই নদী মহানন্দা হলেও কালের গতিতে রুগ্নপ্রায় সে নদী। একসময়ের কল্লোলিনী এখন চুপিসারে কোনোরকম বয়ে যায়। কয়েক দশক পিছিয়ে গেলেও দেখা যাবে নদীর জল শুধু চাষবাসের কাজেই লাগত না, নদীতে মাছ ধরেই দিন গুজরান হত তীরবর্তী জেলেপাড়ার হাজার বাসিন্দার। বর্ষায় ভরো ভরো নদীতে দিনভর নাও বেয়ে জাল টেনে পাটাতন ভরা রূপালি শস্য ঘরে তুলতেন জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ। খয়রা, পুঁটি, মৃগেল, খলিসা, ট্যাংরার ঝাঁক ধরা দিত জালে। বর্ষার উপার্জনে রঙিন হত শরৎ। দেবীপক্ষের সূচনায় মুখের হাসি চওড়া হত বাড়ির ছেলে-বুড়োর। পুজোয় নতুন কিছুর বোধন হত জালভরা রূপালি শস্যের হাত ধরেই। যাঁরা মহানন্দায় মাছ ধরছেন কয়েক দশক ধরে তাঁরা ভালো টের পান বদলটা। আগে যে নদী ফেরাত না কাউকেই, আজ সেই নদীই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

- Advertisement -

নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করার জন্যই পুরাতন মালদায় নদীতীর বরাবর গড়ে উঠেছে একাধিক জেলেপাড়া। যেমন নবাবগঞ্জের বাঁশহাটি, বাচামারি হালদারপাড়া, সাহাপুর পাবনাপাড়া ইত্যাদি। ক্রমশ সংখ্যাটা কমে এলেও এখনও ওই এলাকাগুলির বহু মানুষ মহানন্দায় মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁরা জানান, সময় ভালো যাচ্ছে না। নানা কারণে মহানন্দায় আর মাছ মেলে না আগের মতো। দূষণ তো আছেই। তার সঙ্গে নদীতে জলের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সমস্যা প্রবল আকার ধারণ করেছে। তার ওপর বৃষ্টি প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় মহানন্দা এবার যেন মাছশূন্য।

পুরাতন মালদার নবাবগঞ্জের কাছে নদীর বুকে বড়ো জাল পেতে বসেন বছর পঞ্চাশের মিলন হালদার। মাছ ধরেই তাঁর অর্ধেক জীবন কেটে গিয়েছে। মুখ ভার তাঁরও। দিনান্তে কখনও জোটে এক কিলো বা দেড় কিলো মাছ। স্থানীয় বাজারে তা বেচে মেলে দেড়শো থেকে দুশো টাকা। গতবছর আট হাজার টাকা দিয়ে বড়ো জাল কিনেছিলেন। বছর ঘুরতে তাপ্পি পড়েছে সেই জালে। কোথাও বা ছ্যাঁদা অনেকটাই। তবে দেখা গেল জাল মেরামতের তাগিদ নেই তাঁর। জানালেন, মাছ থাকলে তো জাল মেরামত করব। জাল এমনিও ফাঁকা অমনিও ফাঁকা। নদীতে মাছের আকাল যে পুজোর আনন্দে ভাগ বসাবে মানলেন সে কথাও। নৌকার দাঁড়ে বসে তাঁর খেদোক্তি, আগে মাছ বিক্রি করে বউ, ছেলে, মেয়েদের পুজোর জামাকাপড় কিনে দিতাম। তবে এখন আর সে উপায় নেই। মাছ আর ওঠে না। যেটুক পাই, তা চাল, ডাল, তেল, নুনেই ফুরিয়ে যায়।

জিতেন হালদার, রমেন হালদার বা অসীম হালদারের মতো পেশাদার মৎস্যজীবীদের পরবর্তী প্রজন্ম আর এই পেশায় আসছেন না। বাপ-ঠাকুরদার পেশার তুলনায় দিনমজুরের পেশাকে শ্রেয় মনে করছেন তাঁরা। নদী নিষ্ফলা বলেই জেলেদের পাড়ায় থেকেও যেন নেই শরতের পেঁজাতুলো মেঘ, ভোরের শিশির মাখা শিউলি বা ফেনা ফেনা কাশফুল। নদীর বুক চিরে কখনও সখনও বযে যাওযা শরতের উদাস বিকেলের হাওয়ায় অজান্তেই চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে মিলন, রমেন, অসীমদের। খুব বাস্তব মনে হয় তখন গানের ওই দুই কলিই….. আমায় ভাসাইলি রে, আমায় ডুবাইলি রে।