কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসে বাংলা ভাষা আবশ্যিক করার দাবি

পঙ্কজ মহন্ত, বালুরঘাট : মহারাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলিতে মারাঠি ভাষার ব্যবহার আবশ্যিক করেছে ঠাকরে সরকার। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার তেমন লক্ষ করা যায় না। ব্যাংক থেকে শুরু করে রেল পরিষেবা নিতে গেলে ইংরেজি ও হিন্দি ছাড়া কাজ হয় না অনেক ক্ষেত্রেই। যার জেরে কার্যত গ্রাম বাংলার মানুষ নিত্যদিন সমস্যায় পড়েন। মহারাষ্ট্রে মারাঠি ভাষা আবশ্যিক হলে বাংলায় বাংলা হবে না কেন! কি ভাবছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা থেকে শুরু করে বালুরঘাটের বুদ্ধিজীবী মহল!

এই বিষয়ে বালুরঘাটের বিশিষ্ট গল্পকার কৌশিকরঞ্জন খাঁ বলেন, মাতৃভাষার বিকাশ ছাড়া জাতিসত্তার বিকাশ সম্ভব নয়। তামিল, অন্ধ্র, কেরল এই বিষয়টি আগেই উপলব্ধি করেছিল। বাংলাদেশের জন্ম না হলে বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পেছনের সারিতে চলে যেতে হত। ইতিমধ্যেই মহারাষ্ট্র সরকার তাদের মাতৃভাষাকে বাধ্যতামূলক করছে। পশ্চিমবঙ্গেও সমস্ত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারি কাজ বাংলাতে হওয়া উচিত। পাশাপাশি, গাড়ির নম্বর প্লেট, দোকানের নামে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। বাংলা ভাষার মর্যাদা টিকিয়ে রাখতে বাংলা ভাষা আবশ্যক করা অতি প্রয়োজন। এই বিষয়ে বালুরঘাটের বিশিষ্ট কবি অতনু গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক এই আদেশনামা অনেক দিনের। বাঙালি সাধারণত নিজের ভাষায় কথা বলতে একটু হীনমন্যতায় ভোগে। কিন্তু ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে একটা সামাজিকভাবে শ্লাঘা অনুভব করে। এই কলোনিয়াল মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। রাজ্য সরকার বাঙালির হীনমন্যতা কাটানোর জন্য বিশ্ববাংলা ট্যাগলাইন আমাদের চেতনায় গেঁথে দিয়েছেন। আমরা বাংলা ভাষার আরও প্রচার চাই। মহারাষ্ট্রের তিলক বলেছিলেন, আজ বাঙালি যা ভাবে, ভারত আগামীকাল সেটা ভাবে।

- Advertisement -

এই বিষয়ে আরএসপির জেলা সম্পাদক তথা বালুরঘাটের বিধায়ক বিশ্বনাথ চৌধুরী বলেন, মাতৃভাষার ওপরে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা উচিত। বাংলা ভাষার মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে বিভিন্ন সরকারি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার বিকল্প রাখা প্রয়োজন গ্রাম বাংলার খেটে খাওয়া মানুষ ব্যাংকে টাকা লেনদেনের সময় এক প্রকার হয়রানির শিকার হয়। টাকা জমা দিতে বা তুলতে গিয়ে তারা পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েন। অনেকেই বাংলা ভাষা ছাড়া কিছু জানেন না অথবা সাক্ষরতার প্রথম ধাপে রয়েছে। সেই সব জায়গায় বাংলা ভাষায় বিকল্প থাকলে তারা আত্মনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীন আমরা একাধিক সরকারি দপ্তরে বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছিলাম এবং সেই সিদ্ধান্তমতো আমাদের কাজও শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কিছু অনাবশ্যক কারণে সেই পরিকল্পনা মাঝ পথে থমকে যায়। অন্যদিকে, বর্তমান যুগে বাংলা ভাষার সঙ্গে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষারও যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। বিজেপির বালুরঘাট টাউন সভাপতি সুমন বর্মন বলেন, বাংলা ভাষার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় উপরেও নজর দেওয়া উচিত। কারণ এই বিশ্বায়নের যুগে মাতৃভাষা ছাড়াও বহু মানুষের দ্বারা ব্যবহৃত ভাষার প্রয়োগ বেড়েই চলেছে। তাই রাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তরগুলিতে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষার ক্ষেত্র রাখা উচিত। স্থানীয় ভাষার গুরুত্ব অস্বীকার করার জায়গা নেই। কারণ, প্রচুর অল্প শিক্ষিত মানুষদের লেখা ও বলার মাধ্যম একমাত্র বাংলা। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরগুলিতে বাংলা ভাষার অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে যেমন মাতৃভাষার মান বজায় থাকবে। ঠিক তেমনি বহুল ব্যবহৃত ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার অবলুপ্তি ঘটবে না। পাশাপাশি, বিভিন্ন সরকারি জায়গায় কাজের জন্য গেলে কাগজপত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার করা শুরু হলে বাঙালি তাদের আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাংলায় বয়ান পূরণ করতে পারবে।

দক্ষিণ দিনাজপুর জাতীয় কংগ্রেসের জেলা নেতা গোপাল দেব বলেন, আমাদের দেশে বহু ভাষাভাষী মানুষের সহাবস্থান। পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে একাধিক ভাষা ব্যবহারকারী মানুষরা বাস করেন। তবে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগঞ্জের মানুষদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তরগুলিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার করা উচিত। এখন সরকারি হাসপাতালগুলোতে বাংলা ভাষার প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। গ্রাম বাংলার প্রচুর মানুষ কর্মসূত্রে রেলে যাত্রা করেন। ওই সব মানুষ রেলের টিকিট কাটতে গেলে ইংরেজি, হিন্দি ছাড়া কোনও বিকল্প না পেয়ে বিপদে পড়েন। সেখানে বাংলা ভাষার বিকল্প থাকলে তারা অনায়াসেই কারও সাহায্য ছাড়াই রেলের টিকিট কাটতে পারবে। পাশাপাশি, ব্যাংক, পোস্ট অফিস সহ একাধিক কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলিতে বাংলা ভাষার প্রয়োগ করা উচিত। প্রচুর মানুষ ব্যাংকে গিয়ে তাদের সমস্যার কথা বললে ব্যাংকের তরফে হিন্দিতে উত্তর দেওয়া হয়। তারা তা সঠিকভাবে বুঝতে পারেন না। ফলে তাদের সমস্যার সমাধান বিলম্বিত হয়।

এই বিষয়ে তৃণমূলের জেলা কোর কমিটির সদস্য তথা যুব সভাপতি অম্বরিশ সরকার জানান, পশ্চিমবঙ্গের খুব কম মানুষই হিন্দি ভাষা বুঝতে পারে এবং তার চেয়ে কম সংখ্যক মানুষ হিন্দি ভাষায় কথা বলতে পারেন। হিন্দি ভাষায় লিখতে পারার ক্ষমতা গুটিকয়েক মানুষের রয়েছে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে রাজ্যের কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলিতে কাজ করতে গিয়ে বাংলার মানুষের যোগাযোগের সমস্যা হয়। ভাষা আদানপ্রদানের এই সমস্যার কারণে বাংলার মানুষ প্রচুর পরিমাণে সমস্যায় পড়েন। পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষার বিকল্প রাখা উচিত। রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সরকারি জায়গাগুলিতে বাংলা ভাষায় কাজ করার প্রক্রিয়া চালু করেছে। তাছাড়াও বিভিন্ন সচেতনতামূলক সরকারি ব্যানার, ফ্লেক্সে বাংলা ভাষায় প্রচার করা হচ্ছে। বাংলার মানুষের মাতৃভাষার গুরুত্ব বজায় রাখতে রাজ্য সরকারের দপ্তরগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তরগুলোতেও বাংলা ভাষার আবশ্যিকতা প্রয়োজন।