জ্যোতি সরকার, জলপাইগুড়ি : বাংলা তথা ভারতের ইতিহাস ও সাহিত্যে দেবী চৌধুরানি একটি অতিপরিচিত চরিত্র। বর্তমানে এপার বাংলার জলপাইগুড়ি এবং ওপার বাংলার রংপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় দেবী চৌধুরানির উপস্থিতির নানা প্রমাণ মিলেছে। জলপাইগুড়ি শহরের উপকণ্ঠে গোশালা মোড় এলাকার দেবী চৌধুরানি মন্দিরটি এর অন্যতম। বহু পুরোনো এই মন্দিরটি বর্তমানে ভগ্নদশাগ্রস্ত। সরকারিভাবে কোনো পদক্ষেপ না করা হলে ভবিষ্যতে এই প্রাচীন মন্দিরের ভবনটির কোনো অস্তিত্ব থাকবে কিনা, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নাগরিকরা। জলপাইগুড়ি ফণীন্দ্রদেব ইনস্টিটিউশনের প্রাক্তন শিক্ষক বীরেন্দ্রনাথ রায় বলেন, জলপাইগুড়ির ইতিহাস সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অবহিত করাটা আমাদের কর্তব্য। দেবী চৌধুরানি মন্দিরের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য সদর্থক পদক্ষেপ করা হোক।

অবিভক্ত বাংলায় তিস্তা নদীর জলপথ ব্যবহার করে নানা জায়গায় যাতায়াত করতেন দেবী চৌধুরানি। প্রচলিত মত অনুযায়ী বৈকুণ্ঠপুর বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ে আনন্দমঠ উপন্যাসে যে এলাকার বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে তিস্তার পাড়ে থাকা বৈকুণ্ঠপুর বনাঞ্চলের সাদৃশ্য রয়েছে। পরবর্তীতে বেশ কিছু বিষয় সামনে আসায়, এই ধারণা অনেকটাই বাস্তবের জমি পেয়েে। বর্তমান বাংলাদেশের রংপুর জেলার চিলমারি থেকে তিস্তা নদী দিয়ে দেবী চৌধুরানি জলপাইগুড়ির দিকে আসতেন। ১৯৯০ সালে শিলিগুড়ির চম্পাসারি এলাকা থেকে একটি নৌকা পাওয়া যায়। ওই নৌকাটি দৈর্ঘ্যে লম্বা হলেও প্রস্থে সংকীর্ণ ছিল। সাধারণভাবে ছিপ নামে পরিচিত এই নৌকা জলপথে দ্রুত চলাচলের জন্য ব্যবহার করা হত। ২০০৬ সালে শিলিগুড়ির মাটিগাড়া এলাকা থেকেও একই ধরনের আরও একটি নৌকা পাওযা যায়। ওই দুটি নৌকা আপাতত উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে হেরিটেজ বিভাগে রাখা হয়েছে।

নৌকা দুটির কাঠের নমুনা লখনউয়ে বীরবল সাহানি ইনস্টিটিউট অফ প্যালিওসায়েন্স-এ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েিল। সেখানে পরীক্ষা করে জানা যায়, নৌকাগুলির বয়স ২০০ বছরেরও বেশি। ফলে সেসময় দেবী চৌধুরানি নৌকা করে জলপাইগুড়ি সহ বৈকুণ্ঠপুর বনাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করতেন বলে ধারণা করা হয়। জলপাইগুড়ির গোশালা মোড় এলাকায় থাকা ওই মন্দিরে দেবী চৌধুরানির ডেরা ছিল বলেই ইতিহাসবিদদের মত। তাঁদের দাবি, দেবী চৌধুরানির উপস্থিতি ছিল দেখেই মন্দিরের এমন নামকরণ করা হয়েছে। সেসময় বৈকুণ্ঠপুর এলাকাটির মালিকানা নির্দিষ্ট কারও হাতে ছিল না। তাই এই এলাকাটি নিরাপদ বলে মনে করতেন দেবী চৌধুরানি। ১৯৫৪ সালে আরএস খতিযানে জলপাইগুড়ির রায়কত পরিবারের তরফে গোশালার মন্দিরটিকে দেবী চৌধুরানি মন্দির হিসাবে ভূমি ও ভূমিসংস্কার দপ্তরে নথিভুক্ত করা হয়েছে। রায়কত পরিবার মন্দিরে আর্থিক সহায়তাও করত।

বর্তমানে পুরোনো মন্দিরটির অবস্থা ভালো নয়। প্রাচীন ভবনের অধিকাংশই ভেঙে গিয়েছে। পাশেই নতুন মন্দির তৈরি করে পুরোনো বিগ্রহকে সেখানে নিয়ে যাওযা হয়েছে। কয়েক বছর আগে রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের নির্দেশে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় একটি হেরিটেজ কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি ২০১১ সালে এই মন্দিরকে হেরিটেজ স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশও জানায়। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি। অথচ ঐতিহ্যবাহী এই মন্দিরের ভবনটি ফের তৈরি করতে বিপুল অর্থ ও প্রযুক্তিগত সাহায্য প্রযোজন। সরকারিভাবে হেরিটেজ স্বীকৃতি না দেওয়া হলে এই কাজ হওযা সম্ভব নয়। ওই হেরিটেজ কমিটির প্রাক্তন কোঅর্ডিনেটর ডঃ আনন্দগোপাল ঘোষ বলেন, জলপাইগুড়ির গোশালা মোড়ের দেবী চৌধুরানি মন্দির অতীতদিনের সাক্ষী। হেরিটেজ কমিশনের কাছে মন্দিরটিকে হেরিটেজ স্বীকৃতি দেওযার দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও মন্দিরটি সেই স্বীকৃতি পায়নি।