মিড ক্যাপ কোম্পানিগুলির শেয়ারের চাহিদা বাড়তে পারে

বোধিসত্ত্ব খান : একটি চেনা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে নিফটি এবং সেনসেক্স। ১১,৩০০ থেকে ১১,৬০০- এই ৩০০ পয়েন্টের জন্যই যেন কেনাবেচা চলছে শেয়ার বাজারে। এফএমসিজি এবং টেলিকম সেক্টর আপাতত একটা সাম্যাবস্থা বজায় রাখছে। এছাড়া বিভিন্ন সপ্তাহে বিভিন্ন সেক্টর হয় র‌্যালি করছে কিংবা ছোট সংশোধন দেখাচ্ছে।

বিভিন্ন ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার খবরে একটি করে ফার্মা কোম্পানির শেয়ারের দাম হয়তো বৃদ্ধি হচ্ছে, তবে বাজারে একটি সেক্টরের শেয়ারের দাম বাড়লেই তা বিক্রি করে যে সেক্টরে পতন এসেছে বা সংশোধন হয়েছে তাতে বিনিয়োগ শুরু হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ ১০ থেকে ১৫ শতাংশের পরিবর্তনের জন্য একটি সেক্টর থেকে আরেকটি সেক্টরে টাকার অভিমুখ ঘুরে যাচ্ছে। একে পোশাকি ভাষায় সেক্টর রোটেশান বলা হয়ে থাকে। তবে শেয়ার বাজারে গত পাঁচ বছরে পিএসইউ কোম্পানির পারফরমেন্স হতাশজনক। এখানে বিনিয়োগকারীদের সম্পদ সৃষ্টির পরিবর্তে সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। একের পর এক উন্নতমানের কোম্পানির ত্রৈমাসিক ফলাফল, সেলস বা মুনাফা অথবা উন্নতির সম্ভাবনা সবদিক থেকেই হতাশ করেছে। পিএসইউ ব্যাংক, পিএসইউ অয়েল, গ্যাস, এনার্জি, লজিস্টিক, মেটাল ও মিনারেল- সব সেক্টরেই একটি করুণ চিত্র প্রকাশিত হচ্ছে। বিলগ্নিকরণেও এই অবস্থা থেকে কতটা উন্নতি হবে, তা বলা মুশকিল।

- Advertisement -

গত কয়েক বছরে ব্যবসার চরিত্র কিন্তু ক্রমে বদলে চলেছে। ই-কমার্স, ই-ব্যাংকিং, ই-লার্নিং, স্টার্ট আপস, সার্ভিসেস অ্যান্ড ডেলিভারি- সব নতুন ব্যবসা প্রাচীন ব্যবসার ধ্যানধারণাকে বদলে দিচ্ছে। এখন শুধুমাত্র পণ্যের গুণমানতাই নয়, সেই পণ্য বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া, তা ওষুধ হোক বা খাবার, জামা হোক বা আইফোন, মানুষের মনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে এবং আসছে। অর্থাৎ এক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান কমে আসছে, যেখানে ব্যবসাযিক চাহিদা কমছে। অন্যদিকে, সেসব নতুন ব্যবসা বা সেক্টরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হচ্ছে, যা কয়েক বছর আগে মানুষ ভাবতেও পারেনি। যেমন, ভবিষ্যতে মানুষ যাতে ইলেক্ট্রিক গাড়ির দিকে বেশি আগ্রহী হন তার একটা প্রচেষ্টা চলছে। এটা শুধু ভারতে নয়, সারা বিশ্বেই এই ধরনের উদ্যোগ চলছে, যাতে কার্বন নির্গমন দ্রুতগতিতে কমিয়ে আনা যেতে পারে। এজন্য জোর দেওয়া হচ্ছে সৌরশক্তির ওপর।

ভারতের বিভিন্ন সৌরশক্তি কোম্পানিকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে এই ধরনের শক্তির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য। এমনকি যে বড় কোম্পানিগুলি এতদিন তাপবিদ্যুৎ অথবা জলবিদ্যুৎ উত্পাদন করত, তারাও ধীরে ধীরে সৌরবিদ্যুৎ উত্পাদন শুরু করেছে। বহু নামী আইটি (ইনফর্মেশন টেকনলজি) কোম্পানি নিজেদের ব্যবহারের জন্য সৌরশক্তি ব্যবহার আরম্ভ করে দিয়েছে। তবে ভারতে ইলেক্ট্রিক গাড়ির জন্য যে ইলেক্ট্রিক ব্যাটারি প্রয়োজন, তাতে একটি রেয়ার আর্থ মিনারেল ব্যবহার করা হয়। সেই মিনারেলের নাম হল নিওডিমিয়াম। বিশ্বে উৎপাদিত নিওডিমিয়ামের ৮০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করে চিন। নিওডিমিয়ামের ব্যবহার রয়েছে বিভিন্ন ইলেক্ট্রিক সামগ্রীতে। বিশ্বের বিখ্যাত গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানি টেসলা তৈরি করে এই গাড়ি। এই ব্যাটারির আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল ক্যাডমিয়াম। এখানেও চিন বিশ্বের সর্বাধিক উৎপাদনকারী দেশ। ভারতবর্ষও অবশ্য বিশ্বের ১০টি সর্বাধিক ক্যাডমিয়াম উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে অন্যতম।

ভারতবর্ষে ই-লার্নিং গত ৫ থেকে ৬ বছরে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ভারতীয় সীমান্তে চিনা আগ্রাসনে বহু চিনা অ্যাপকে ভারতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মানুষ অবশ্যই লক্ষ করেছে যে, এরপর থেকেই ভারতের বিভিন্ন ই-লার্নিং কোম্পানি শিশু এবং কিশোরদের কোডিং শেখাতে আগ্রহী। এমনভাবে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে যার ফলে মনে হবে যে, কোডিং না শিখলে জীবন বৃথা। আসলে এটা সত্যি যে, বিভিন্ন অ্যাপ তৈরি করার জন্য কোডিংয়ে প্রয়োজন রয়েছে। চিনা অ্যাপ নির্ভরতা কমানোর জন্য ভারতের নিজস্ব অ্যাপ তৈরির প্রয়োজন রয়েছে এবং ভবিষ্যত্ প্রজন্ম কোডিং শিখলে এ প্রয়াস সহজতর হবে এটাও সত্যি। তবে, এর ব্যবসায়িক দিকটা অস্বীকার করাটাও অনুচিত হবে।

চিনের ওপর নির্ভরতা কমাতে ভারতবর্ষ প্রথমেই দেখবে তার নিজস্ব রিসোর্স বা সম্পদ কী রয়েছে। এবং সেই সম্পদকে সবথেকে ভালোভাবে কী করে ব্যবহার করা যায়। এখানে উল্লেখ্য, চিনের ওয়ান চাইল্ড পলিসি ভবিষ্যতে তাদের সবচেয়ে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে চলেছে। সামনের দুই থেকে তিন দশকে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা থাকবেন চিনে। তুলনায় ভারতের যুবশক্তি ও মানবসম্পদ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিনিয়োগকারীদের একটু সতর্ক থাকতে হবে যে, তাঁরা যেসব ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন, তা সামনের ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে অস্তিত্ব সংকটে না ভুগতে থাকে। খ্যাতির শিখরে থাকা বহু কোম্পানি কিন্তু অতীতের গর্ভে লীন হয়ে গিয়েছে। নেই পেজার, নোকিয়া, কোডাক ফিল্মস, ম্যানুয়েল ক্যামেরা, সিডি, ভিসিডি ইত্যাদি। মনে করে দেখুন হ্যান্ডি ক্যামের ব্যবহার পড়তির দিকে।

অর্থাৎ ব্যবসার চরিত্র বদলাচ্ছে অতি দ্রুত। ক্যাপিটাল ইনটেনসিভ ব্যবসা, অর্থাত্ৎযে ব্যবসা করতে প্রচুর মূলধন বা অর্থ বিনিযোগ করে রাখতে হয়, তার জনপ্রিয়তা কমেছে গত এক দশকে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট, রিয়েল এস্টেট, রোডস অথবা পাওয়ার কোম্পানির মতো বড় বড় কোম্পানিগুলি প্রোজেক্ট এগজিকিউশনে পিছিয়ে পড়ছে। ঋণের বোঝা বাড়ছে, অর্ডার কমছে বহুদিন। সাইক্লিক্যাল কোম্পানিগুলির ক্ষেত্রে সমস্যা হলে এতে বিনিয়োগ করে বসে থাকলেও নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। বহু বছরের ধরে থাকা লাভ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় কয়েক মাসের মধ্যেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তুলনায় ডিফেন্সিভ কোম্পানি বা সেক্টরের জনপ্রিয়তা কমেনি। ফার্মা, আইটি, এফএমসিজি অন্য সেক্টরের তুলনায় অধিক নিশ্চয়তা দিয়ে চলেছে।

সম্প্রতি বাজারে আসা আইপিওগুলি অবাক করে চলেছে। আইআরসিটিসি, হ্যাপিয়েস্ট মাইন্ডটেক, রোসারি বায়োটেক, বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ দ্বিগুণ করে দিয়েছে বা দিতে এগোচ্ছে। হ্যাপিয়েস্ট মাইন্ড মাত্র ছয় ঘণ্টায় বিনিয়োগকারীদের অর্থ দ্বিগুণ করে দিয়েছে। অবশ্য এই আইপিওর বিপুল চাহিদার ফলে অনেক বিনিয়োগকারী এর শেয়ার পাননি। আর রিটেল ইনভেস্টাররা যাঁরা পেয়েছেন, তা মোট আবেদনের অনেকাংশে কম। হ্যাপিয়েস্ট মাইন্ডের সবচেয়ে বেশি সাফল্যের কারণ অবশ্যই এর বুক ভ্যালুর তুলনায় কম দামে আইপিও অফার করা যা বিনিয়োগকারীরা লুফে নিয়েছেন।

২১ সেপ্টেম্বর ক্যামস (কম্পিউটার এজ ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস)-এর আইপিও বাজারে আসছে। এটা ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় রেজিস্ট্রার এবং মিউচুয়াল ফান্ড ট্রান্সফার এজেন্ট। এছাড়া এটা ইনসুরেন্স কোম্পানিগুলির পলিসি রিপোসিটরি হিসেবে কাজ করে এবং গ্রাহকদের কেওয়াইসি (নো ইয়োর ক্লায়েন্ট) হিসেবে কাজ করে। আইপিওগুলির সাম্প্রতিক সাফল্যগুলি অবাক করছে। কারণ, এটা ঠিক যে বুল মার্কেট, তা কিন্তু জোর গলায় বলা চলে না। অক্টোবর থেকে দ্বিতীয় কোয়ার্টারের ফলাফল আসতে আরম্ভ করবে। কোম্পানিগুলি কিছুটা হলেও মহামারির ধাক্কা সামলাতে পেরেছে কি না, তা খানিকটা হলেও জানা যাবে। এখানেও খেয়াল করার মতো বিষয় হল এই যে, কোম্পানিগুলি বাজারে সাফল্য লাভ করছে, তারও প্রায় সবকটাই অ্যাসেট লাইট কোম্পানি।