একুশের ভোটে বিরোধীদের অস্ত্র হেমতাবাদে কলেজের দাবি

বিশ্বজিৎ সরকার, হেমতাবাদ : তপশিলি এবং সংখ্যালঘু অধ্যুষিত হেমতাবাদ বিধানসভা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কলেজ স্থাপনের দাবি উপেক্ষিতই রয়েছে। উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে এলাকার গরিব ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক ছেলেমেয়ে উচ্চশিক্ষায় ইতি টানতে বাধ্য হন। বাধ্য হয়ে তাঁরা দলেদলে ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজ করতে চলে যান। এই পরিস্থিতিতে এলাকার বহু শিক্ষক এবং পড়ুয়াই হেমতাবাদে কলেজ স্থাপনের দাবি তুলেছেন। এর পাশাপাশি শাসক এবং বিরোধী, দুই পক্ষই এ নিয়ে সরব হওয়ায় আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে হেমতাবাদে কলেজের দাবিই অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছে।

রায়গঞ্জ থেকে হেমতাবাদের দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। হেমতাবাদ থেকে সীমান্তবর্তী এলাকা আরও প্রায় ২০ কিলোমিটার। এতদূর থেকে রায়গঞ্জে গিয়ে পড়াশোনা করতে বড়ো অঙ্কের টাকা খরচ হয়ে যায় যাতায়াতেই। নিম্নবিত্ত ও গরিব ঘরের পড়ুয়াদের পক্ষে সেই খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। এজন্য হেমতাবাদ ব্লকের পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েত ছাড়াও সংলগ্ন রায়গঞ্জ ব্লকের কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং কালিয়াগঞ্জ ব্লকেরও কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দারা হেমতাবাদে দীর্ঘদিন ধরেই একটি কলেজের দাবি করে আসছেন। প্রত্যন্ত এলাকার ছাত্রছাত্রীদের পঠনপাঠনের জন্য হয় রায়গঞ্জ নয়তো কালিয়াগঞ্জে যেতে হয়। অনেক সময় তাঁরা অনেকেই কলেজে ভর্তিরও সুযোগ পান না। কারণ স্থানীয় ভিত্তিতে অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে তাঁরা পিছিয়ে পড়েন। ফলে একসময় অনেকেরই উচ্চশিক্ষার স্বপ্নভঙ্গ হয়।

- Advertisement -

হেমতাবাদ বিধানসভার বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় ১৩টি উচ্চমাধ্যমিক স্কুল রয়েছে, যার মধ্যে একটি মাদ্রাসা। এই বছর ১,৫২৫ জন ছাত্রছাত্রী এখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল। উত্তীর্ণ হয়েছে ১,৪৩৫ জন। হেমতাবাদের উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা পড়ুয়াদের রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় ও রায়গঞ্জ সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ওপরেই নির্ভর করতে হয়। দুই কলেজে পাস ও অনার্স মিলিয়ে মোট ৫,৮৩৫টি আসন রয়েছে। ইটাহার, কালিয়াগঞ্জ, রায়গঞ্জ, করণদিঘি সহ একাধিক ব্লকের পড়ুয়ারা উচ্চশিক্ষার জন্য রায়গঞ্জের এই দুটি কলেজে ভর্তি হন। ভিনজেলা থেকেও ছাত্রছাত্রীরা রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসেন। ফলে যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে, তার থেকে কম পরিমাণ আসন রয়েছে বলে পড়ুয়াদের দাবি।

হেমতাবাদ আদর্শ বিদ্যালয়ের শিক্ষক দীপাঞ্জন সরকার বলেন, হেমতাবাদে প্রতিবছর এক হাজারের বেশি পড়ুয়া উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে। অধিকাংশই দুঃস্থ পরিবারের। রায়গঞ্জ অথবা কালিয়াগঞ্জ কলেজে ভর্তি হয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে একাংশ পড়ুয়া মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। হেমতাবাদে একটি কলেজ হলে পড়ুয়াদের উচ্চশিক্ষা নিতে সুবিধা হবে। হেমতাবাদ ব্লকের ভরতপুর হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক সোমনাথ দাস বলেন, আমার স্কুল বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায়। এখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা ছেলেমেয়েদের প্রতিদিন যাতায়াত করা সম্ভব নয়। কিছু পড়ুয়া রায়গঞ্জ সহ অন্যান্য কলেজে ভর্তি হলেও যারা দুঃস্থ ঘরের ছাত্রছাত্রী তাদের উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেই পড়াশোনা শেষ করতে হয়। হেমতাবাদে একটি কলেজ হওয়া একান্ত জরুরি।

হেমতাবাদ বিধানসভায় গত বিধানসভা নির্বাচনে বামেদের প্রার্থী দেবেন্দ্রনাথ রায় জয়ী হয়েছিলেন। তিনি পরবর্তীকালে বিজেপিতে যোগ দেন। সম্প্রতি রহস্যজনকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। বিজেপির জেলা সভাপতি বিশ্বজিৎ লাহিড়ি বলেন, এখানকার ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতে কাছাকাছি একটি কলেজ হওয়া খুব জরুরি। বামেরাও এখানকার মানুষকে উপেক্ষা করেছে। তাঁরা তৃণমূল জমানাতেও উপেক্ষিত হয়েছেন। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এখানে অবশ্যই কলেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। রায়গঞ্জের বিধায়ক তথা কংগ্রেসের জেলা সভাপতি মোহিত সেনগুপ্ত বলেন, হেমতাবাদে একটি কলেজ স্থাপন করা প্রয়োজন। বাম-কংগ্রেস জোটে বিজয়ী দেবেন্দ্রনাথ রায় বিধানসভায় এ নিয়ে একাধিকবার সোচ্চার হয়েছিলেন। পরবর্তীতে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি আর এ বিষয়ে সোচ্চার হননি।

সিপিএমের জেলা সম্পাদক অপূর্ব পাল বলেন, হেমতাবাদে একটি কলেজ করা একান্তই জরুরি। অনেক পড়ুয়াই মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিয়ে ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজে চলে যান। যদিও তৃণমূলের জেলা সভাপতি কানাইয়ালাল আগরওয়াল বলেন, হেমতাবাদের কাছাকাছিই রয়েছে রায়গঞ্জ। রায়গঞ্জে একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি কলেজ রয়েছে। পাশাপাশি কালিয়াগঞ্জেও একটি কলেজ রয়েছে। ফলে এখানকার ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যদি কোনও পড়ুয়ার ভর্তির ক্ষেত্রে সমস্যা হয়, সেই ক্ষেত্রে বিষয়টি আমাদের নজরে এলে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

হেমতাবাদ আদর্শ বিদ্যালয়ে ছাত্র মনজুর আলম বলেন, রায়গঞ্জের কলেজে ভর্তি হতে গেলে মেস ভাড়া করে থাকতে হবে। সেটা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যাতায়াতের ভাড়াই প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ টাকা চলে যাবে। সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা আরেক ছাত্র শাহিন আক্তার বলেন, জমিতে কাজ করে পড়াশোনা করতে হয়। রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় বা রায়গঞ্জ সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হলে কলেজে যাতায়াত ও টিউশনি খরচ মিলে মাসে ৫০০০ টাকা লাগবে। তা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা আরেক ছাত্রী প্রিয়াঙ্কা রায়চৌধুরী বলেন, হেমতাবাদ কলেজ নেই। একটি মহিলা কলেজ একান্তই জরুরি। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা গ্রেটা সরকার বলেন, রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। বাড়ি ভাড়া করে থাকার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। তাই যতখানি পারব প্রতিদিন যাতায়াত করে কলেজ করব।