ভাস্কর শর্মা, আলিপুরদুয়ার : সাপের কথা শুনলেই মানুষ সাধারণত আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সাপ নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের ভ্রান্ত ধারণাও রয়েছে। তাই বহু এলাকায় নির্বিচারে সাপ মেরে ফেলা হয়। কিন্তু সব সাপ যেমন বিষাক্ত নয়, তেমনি সাপ যে আমাদের কত উপকারে লাগে তাও অনেকের কাছে অজানা।

কোন এলাকায় কত সংখ্যক হাতি, গন্ডার, বাঘ ইত্যাদি রয়েছে সে সম্পর্কে বন দপ্তরের কাছে পরিসংখ্যান থাকলেও সাপ সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো পরিসংখ্যান নেই বললেই চলে। তাই সর্পপ্রেমী মানুষ সহ সাপ নিয়ে কাজ করে এমন বেশকিছু সংস্থা উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চলগুলিতে সাপ সংরক্ষণের জন্য স্নেকপার্ক গড়ার দাবি তুলেছে। সেইসঙ্গে বিভিন্ন মহলের তরফে সাপ নিয়ে সমীক্ষা করারও দাবি উঠে এসেছে। তবে আদৌ উত্তরবঙ্গের সাপের সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব কিনা, কোন এলাকায কী ধরনের সাপ রয়েছে সে ব্যাপারে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা যাবে কিনা ইত্যাদি বিষয়ে প্রামাণ্য নথি তৈরি করতে সাপ নিয়ে সমীক্ষা ও সর্প উদ্যান গড়া জরুরি হয়ে পড়েছে বলে বনকর্তারা মনে করছেন।

- Advertisement -

বন দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এরাজ্যে প্রায় ১১৪ প্রজাতির সাপ রয়েছে। এরমধ্যে ৯৮ প্রজাতিই উত্তরবঙ্গে পাওয়া যায়। অর্থাৎ গোটা রাজ্যে প্রায় ৮৬ শতাংশ সাপই উত্তরবঙ্গে পাওয়া যায়। এরমধ্যে ১৮ প্রজাতির সাপ বিষধর। বাকি ৭৭ শতাংশ সাপই বিষহীন। এছাড়া, উত্তরবঙ্গে যে ৯৮ প্রজাতির সাপ রয়েছে তার মধ্যে ৭৬টি আলিপুরদুয়ারের বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে দেখতে পাওয়া যায়। জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে মেলে ৩৯ প্রজাতির সাপ। পাশাপাশি, আলিপুরদুয়ার জেলায় যত ধরনের সাপ দেখতে পাওয়া যায় তা রাজ্যের আর কোনো জেলাতেই পাওয়া যায় না বলে সর্প বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

আলিপুরদুয়ার সহ উত্তরবঙ্গজুড়ে যে সাপের বিপুল ভাণ্ডার রয়েছে তা ব্রিটিশরাও টের পেয়েছিল। সেকারণে তাদের আমলেই উত্তরবঙ্গে প্রথম সাপ নিয়ে সমীক্ষার কাজ শুরু হয়। ১৯১০ সালে ব্রিটিশ সর্পবিশারদ এফ ওয়াল উত্তরবঙ্গে প্রথম সাপের তালিকা প্রকাশ করেছিলেন। সাম্প্রতিককালেও অনেক সর্পবিশারদ ও সংস্থা সাপ নিয়ে সমীক্ষার কাজ করেছে। ১৯৯৯ সালে গরুমারা ও চাপড়ামারিতে সাপ নিয়ে সমীক্ষা হয়েছিল। ওই সমীক্ষার পর গাইড টু স্নেক অফ গরুমারা ন্যাশনাল পার্ক নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। ওই বইটি বন দপ্তরের অন্যতম প্রামাণ্য নথি। এরপর ২০০৫ সালে জলদাপাড়াতেও সাপ নিয়ে সমীক্ষা হয়েছিল। ওই সমীক্ষায় মক ভাইপার, ব্রাউন ভাইপার, ইন্দো চায়না র‌্যাট স্নেক সহ আরও বেশকিছু প্রজাতির সাপের হদিস পাওয়া গিয়েছিল বলে বন দপ্তর সূত্রে খবর।

এ বিষয়ে আলিপুরদুয়ার বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সংস্থার সম্পাদক কৌশিক দে বলেন, বাস্তুতন্ত্রে সাপের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু আমাদের অজ্ঞতার কারণে বহু বিলুপ্তপ্রায় সাপকেও আমরা মেরে ফেলছি। এই পরিস্থিতিতে গোটা উত্তরবঙ্গেই সাপ নিয়ে সমীক্ষার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আলিপুরদুয়ার জেলায় সমীক্ষার পাশাপাশি একটি সর্প উদ্যানও গড়া প্রযোজন। এছাড়া সর্প উদ্যান তৈরি হলে আগামীদিনে গবেষকদেরও অনেক সুবিধা হবে বলে কৌশিকবাবু জানিয়েছেন।

বিশিষ্ট সর্পবিশারদ তথা রাজ্য সরকারের রিসোর্সপার্সন ডঃ দয়ালবন্ধু মজুমদার বলেন, উত্তরবঙ্গে সাপের কামড়ে কতজন মারা যান সেবিষয়ে কোনো সঠিক হিসেব স্বাস্থ্য দপ্তর বা অন্য কোথাও থেকে পাওয়া যায় না। তাই উত্তরবঙ্গে সর্প উদ্যান গড়লে, যাঁরা সাপ নিয়ে গবেষণা ও কাজ করেন, তাঁদের অনেক সুবিধা হবে। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গেও সাপের বিষ থেকে এভিএস বা অ্যান্টিভেনম সিরাম তৈরির পরিকাঠামো গড়া যায় কিনা তা সরকারকে ভাবতে হবে। এই এলাকায় সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরি হলে উত্তরবঙ্গের মানুষেরই উপকারে আসবে বলে ডঃ মজুমদার জানিয়েছেন।

এ বিষযে বন দপ্তরের বন্যপ্রাণ শাখার প্রধান বনপাল রবিকান্ত সিনহা বলেন, উত্তরবঙ্গে সর্প উদ্যান ও সমীক্ষা হলে সাপ নিয়ে অনেক তথ্যই সামনে আসবে। ইতিমধ্যেই বেশ কিছুদিন আগে জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের মাঝে একটি সর্প উদ্যান গড়ার প্রস্তাব আমরা রাজ্য সরকারের কাছে জমা দিয়েছি। পাশাপাশি সাপ নিয়ে সমীক্ষারও একটি প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি শীঘ্রই রাজ্য ওই প্রস্তাবে সায় দেবে।