পূর্ণেন্দু সরকার,  জলপাইগুড়ি : জলপাইগুড়ির  বৈকুণ্ঠপুর রাজ্যের রাজা জগদীন্দ্র দেব রায়কত সরাসরি স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ না নিলেও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামীদেরও নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। দেশের প্রতি টান এবং ইংরেজদের প্রতি বিদ্বেষ তাঁকে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাশে থাকার সাহস জুগিয়েছিল। সেই রাজার বংশধররা এখন দিনমজুরি করে এবং অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালান। জলপাইগুড়ি সদর ব্লকের দক্ষিণ বেরুবাড়ির পেটভাতা গ্রামে ছিল রাজা জগদীন্দ্র দেব রায়কতের জন্মভিটে। এই গ্রামেই বসবাস করেন রাজার বংশধর জগৎ অধিকারী ও তাঁর পরিবার।

পেটভাতা গ্রামের পূর্বতন নাম ছিল ব্রাহ্মণপাড়া। এখন সেখানকার অর্ধেক জমি বাংলাদেশে চলে গিয়েছে। এই পাড়াতেই থাকতেন বৈকুণ্ঠপুরের রাজা যোগেন্দ্র দেব রায়কতের শ্বশুর রঙ্গলাল অধিকারী এবং যোগেন্দ্র দেবের পোষ্যপুত্র বৈকুণ্ঠপুর রাজ্যের রাজা জগদীন্দ্র দেব রায়কত। রাজা যোগেন্দ্র দেব তাঁর শ্বশুর রঙ্গলাল অধিকারীকে পেটভাতি জোত বা জমি দান করেছিলেন। সেইসঙ্গে জগদীন্দ্র দেবকে জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়িতে নিয়ে আসেন। জগদীন্দ্র দেব রায়কতের আত্মীয় জগত্ অধিকারী (৮২) তাঁর স্ত্রী এবং এক ছেলেকে নিয়ে পেটভাতায় থাকেন। অন্য দুই ছেলে শিলিগুড়িতে থাকেন।

৬০ বিঘা জমি বহুদিন আগে ২০০ টাকা বিঘা দরে বিক্রি করে দেওয়ার পর এখন তাঁদের নিজস্ব কৃষিকাজের জমি নেই। অন্যের জমিতে আধিয়ার হিসেবে কাজ করেন। জগৎবাবু বলেন, বার্ধক্যভাতাই এখন ভরসা। ছেলে রাজমিস্ত্রির কাজ করে। গ্রাম পঞ্চায়েতের টাকায় একটি ঘর তৈরি করেছেন। কিন্তু সেই ঘরের চালা দিয়ে জল পড়ে।

পেশায় রাজমিস্ত্রি জগৎবাবুর ছেলে মনো অধিকারী পেটভাতার বাড়িতেই থাকেন। তিনি বলেন, আগে আমাদের অনেক জমি ছিল। বাবা জমি বিক্রির কথা বললেও, বহু জমি বেহাত হয়ে গিয়েছে। মামলা করে জমি ফিরিয়ে আনার মতো সামর্থ্য নেই। অন্যের বাড়িতে রাজমিস্ত্রির কাজ করে কষ্টে সংসার চলে। আমিও বাবার মুখে রাজার কথা শুনেছি। আপনারাই দেখুন রাজার বাড়ির লোকেরা এখন প্রজা হয়ে রয়েছেন। জগৎবাবুর দুবার হার্ট অ্যাটাক হয়। কিন্তু অসুস্থ থাকলেও এখন আর চিকিত্সা করানোর মতো সামর্থ্য নেই। তবে ছেলেবেলায় রাজা জগদীন্দ্র দেব রায়কতকে দেখেছেন হাতির পিঠে করে তাঁদের গ্রামের বাড়িতে আসতে। তাঁদের আদর করে আম খেতে দিতেন। চুকানি জমির খাজনা আদায় হত, এখনও সেকথা মনে আছে। সেই রাজার বংশধরদের এখন অভাব-অনটনের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু দেখার কেউ নেই।

উত্তরবঙ্গ লোকসংস্কৃতি সমিতির সম্পাদক উমেশ শর্মা জানান, জলপাইগুড়ি জেলার বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির প্রথম পোষ্য রাজা ছিলেন জগদীন্দ্র দেব রায়কত। কিন্তু রাজপরিবারের অপর রাজা ফণীন্দ্র দেবের কাছে মামলায় হেরে গিয়ে নাবালক প্রসন্ন দেব রায়কতকেই রাজ সিংহাসনে বসিয়ে তিনি সন্ন্যাস নিয়েছিলেন।

১৮৬৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পেটভাতা গ্রামে রাজা জগদীন্দ্র দেব রায়কতের জন্ম হয়। তিনি মারা যান ১৯৩৮ সালের ২৭ অক্টোবর। তিনি জেলা তথা উত্তরবঙ্গে প্রথম রায়কতপাড়ায় মার্গ সংগীতের স্কুল খুলেছিলেন। ১৯২০ সালে জেলা কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি ছিলেন। জালিয়ানওযালাবাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রতিবাদে জগদীন্দ্র দেব রায়কত অস্থায়ী ম্যাজিস্ট্রেট পদত্যাগ করেছিলেন। জলপাইগুড়ি শহরবাসী যখন ইংরেজদের চাপে চিত্তরঞ্জন দাস এবং তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবীকে আশ্রয় দিতে চাননি, সেই সময় জগদীন্দ্র দেব রায়কত তাঁদের রাজবাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তিনি রাজবংশীদের মধ্যে প্রথম বিলেত থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বিজয়চন্দ্র বর্মন বলেন, জলপাইগুড়ির মানিকগঞ্জে এই রাজার আদি নিবাস ছিল। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন এই পরিবারের জন্য কিছু করা যায় কিনা।