পূর্বপুরুষের পদবিই সম্বল ১২ ঘর পাখাধরার

265

সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি : সেই রাজাও নেই, নেই সে রাজত্বও। শুধু রয়ে গিয়েছে কিছু স্মৃতি আর নস্টালজিয়া। অতীতের সেই স্মৃতি নিয়ে রাজ আমলের পদবি আঁকড়ে বেঁচে রয়েছেন কয়েকঘর ছিন্নমূল মানুষ। অথচ একটা সময় ছিল, যখন এঁদের পূর্বপুরুষরা দেখেছেন রাজ আমলের জাঁকজমক, রোশনাই। সেসব অবশ্য এখন গল্পগাথার মতন। এখন শুধু নামের পর পাখাধরা পদবিটুকুই অবশিষ্ট এঁদের।

ধূপগুড়ি শহরের বুকেই ৯ নম্বর ওয়ার্ডে এঁদের বসবাস। এঁদের নামেই এলাকার নাম হয়েছে পাখাধরাটারি। সবমিলিয়ে রয়েছে ১২টি পরিবার। কিন্তু এঁদের ইতিহাস বাকিরা তো দূর অস্ত, শহরেরই বা কজন জানে!

- Advertisement -

একসময় এদের পূর্বপুরুষরা কোচবিহারের রাজাদের নিত্য সহচর ছিলেন। কাজ ছিল, রাজাকে তাল পাতার হাওয়া করে যাওয়া। তাছাড়া রাজবাড়ির অন্দরমহলে দড়িতে টানা পাখার হাওয়া করার গুরুদায়িত্বও ছিল এঁদের ওপরেই। সেই সূত্রেই রাজসিক জীবনযাপন খুব কাছ থেকে দেখা এঁদের পূর্বপুরুষদের। সেই সুবাদেই এখনও কোচবিহার রাজ পরিবারের প্রতি এঁদের আনুগত্য এবং শ্রদ্ধা স্পষ্ট ঝরে পড়ে আলাপচারিতায়।

বর্তমানে মূলত কৃষিকাজ এবং অন্যান্য পেশার ওপর নির্ভরশীল এঁরা। পরিবারগুলির সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, রাজ আমলের একেবারে শেষদিকে রাজার ইচ্ছে এবং নির্দেশেই অধস্তন এই রাজকর্মীদের পরিবার ছড়িয়ে পড়ে কোচবিহার রাজত্বের আনাচে-কানাচে। ছোট ছোট গোষ্ঠীতে ভাগ করে এই মানুষগুলোকে রাজাই বিভিন্ন জায়গায় জমি দান করে ছড়িয়ে দেন। সেভাবেই বর্তমান কোচবিহার জেলার কিছু কিছু জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন এঁরা। কেউ কেউ চলে যান বর্তমান বাংলাদেশের রংপুর জেলায়। সেখান থেকে আবার এদেশে চলে আসে এই পরিবারগুলো। কোচবিহারের ভারতভুক্তির পর নতুন প্রশাসনিক কাঠামোয় কারও কারও কাজও জুটে যায়। তবে সে কাজ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি সিলিং ও টেবিল ফ্যান চলে আসায়।

গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, একসময় জলপাইগুড়ি জেলা শাসকের অফিসেও আধিকারিকদের হাওয়া করার দায়িত্ব ছিল এই পাখাধরাদের ওপরেই। বর্তমানে এঁরা সকলেই নিজেদের রাজবংশী হিসেবে পরিচয় দিলেও গবেষকদের মতে, এঁদের অনেকেরই পূর্বপুরুষদের নিয়ে আসা হয়েছিল সাবেক মগধ বা বিহার এবং ওডিশা থেকে। এরপর এখানেই পেশা ও বৈবাহিক সূত্রে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গিয়েছিলেন এঁরা।

ধূপগুড়িতে ১২টি পাখাধরা পরিবার মিলিয়ে শখানেক মানুষ রয়েছেন। এঁদের মধ্যে সব থেকে বয়স্ক কৃষ্ণ পাখাধরার বয়স এখন ৮০ বছরের বেশি।  শয্যাশায়ী মানুষটি কথাও বলতে পারেন না ঠিকমতো।

তাঁর ভাই প্রফুল্ল পাখাধরার বয়স ৬৭। সাত বছর আগে গ্রাম পঞ্চায়েত কর্মী হিসেবে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে এখন বাড়িতেই। অতীতের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে জানান, তাঁর প্রপিতামহ বিশারু পাখাধরা শেষ পর্যন্ত রাজবাড়িতে কাজ করেছেন। রাজ আমলের শেষদিকে রাজার নির্দেশেই রংপুর হয়ে ধূপগুড়িতে তাঁদের বসবাস শুরু। পূর্বপুরুষের রাজকর্মচারী পরিচয়ে এঁরা এখনও গর্ববোধ করেন।

অশীতিপর প্রফুল্লবাবুর কথায়, পদবিটুকু ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। অনেকেই এই পদবি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এমন পদবি কীভাবে এল, সেসব জানতে চান। অনেকে পদবি বদলেও নিয়েছে। তবে আমরা পদবি পরিবর্তনের পক্ষে নই। এই পদবিটুকু আমাদের পূর্বপুরুষের পরিচয়। এই পদবি মহান কোচবিহার রাজত্বের স্মৃতি বহন করে। আমরা একে আঁকড়েই বাঁচতে চাই।

কোচবিহার রাজ পরিবারের প্রতি এঁদের আনুগত্য এখনও অমলিন। সেই থেকেই এখনও প্রতিবছর মদনমোহনের রাস উত্সবে পরিবার সহ শামিল হওয়ার চেষ্টা করে বলে জানান এঁরা। কালীচরণ পাখাধরার আক্ষেপ, এখন আর কেউ আমাদের নিয়ে ভাবে না। সে ভাবনার সুযোগও নেই। তবুও পূর্বপুরুষের কর্মভূমি কোচবিহার আমাদের কাছে শ্রদ্ধার।

কোচবিহার রাজবাড়ি, রাজাদের ইতিহাস এবং রাজবংশের নানা দিক নিয়ে বহু গবেষণা, লেখা বা তথ্যতালাশ হলেও অন্তজ এই মানুষগুলো সেভাবে জায়গা পাননি ইতিহাসের পাতায়। এই দিকগুলি নিয়ে গবেষণা আখেড়ে কোচবিহার রাজবংশ এবং রাজ পরিবারের গৌরবময় অতীতকেই আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে বলেই মত গবেষকদের।

হলদিবাড়ি কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপিকা তথা গবেষক রত্না রায় বলেন, আমার জন্ম এবং বড় হয়ে ওঠা কোচবিহার শহরে। পরবর্তীতে ইতিহাসের ছাত্রী হিসেবেও কোচবিহার নিয়ে অনেককিছু পড়েছি। তবে এঁদের উল্লেখ সেভাবে পাইনি। বলতে গেলে ইতিহাসের পাতায় এই রাজ কর্মচারীদের ইতিহাস একেবারেই অধরা।

ইতিহাস বা ঐতিহাসিক দলিলে শামিল হওয়ার চাইতেও কোচবিহার রাজ পরিবার, রাজবাড়ি এবং পূর্বপুরুষের অতীত গর্ব নিয়ে বেঁচে থাকা অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্রান্তিক মানুষগুলির কাছে। বাস্তবে এঁরা হয়তো বোঝেনই না যে, এঁরা নিজেরাই আসলে ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।