সেনাউল হক, কালিয়াচক : সাদা কাশে ছেয়ে গিয়েছে গঙ্গার পাড়। দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন নীল আকাশের নীচে একটা সাদা ক্যানভাস। তাতে বাতাসের দোলা লাগছে মাঝেমধ্যে। খাতায় কলমে শরৎ চলে এলেও প্রায়ই শেষ ভাদ্রে বৃষ্টি হচ্ছে পশলায় পশলায়। ক্যালেন্ডার বলছে, আর বাকি মাত্র ২৫ দিন। তারপরেই গোটা বাংলা মেতে উঠবে নিজেদের সেরা উৎসবে। তার তোড়জোড়ও শুরু হয়ে গিয়েছে দিকে দিকে। তোড়জোর শুরু হয়েছে বৈষ্ণবনগরের শোভাপুর পারদেওনাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পারলালপুর গ্রামেও। সেখানে গঙ্গার পাড়ে দুর্গামন্দিরে মাতৃ আরাধনা হয়ে থাকে। যদিও গত কয়েক বছর সেই মন্দিরে মায়ের মূর্তি ওঠেনি। তবে এবার সেখানে দুর্গাপুজো হবে। তেমনটাই আশা গ্রামবাসীদের।

পারলালপুর গ্রামে রাধাগোবিন্দ মন্দির সংলগ্ন দুর্গামন্দির। পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে গঙ্গা। গত কয়েক বছর নদীর রোষ থেকে বাঁচতে পারেননি খোদ দেবীও। গঙ্গার ছোবলে নদীতে তলিয়ে গিয়েছে এলাকার পারঅনুপনগর, গোপাল মণ্ডলপাড়া, ঘোষপাড়া সহ বেশ কয়েকটি গ্রামের দুর্গামন্দির। সেইসব গ্রামের বাসিন্দারা প্রার্থনা করেছিলেন দুর্গতিনাশিনীর কাছে, নিজেকে অন্তত রক্ষা করো মা। মা নিজের মন্দিরও রক্ষা করতে পারেননি। সবার চোখের সামনে নদীতে তলিয়ে গিয়েছে একের পর এক মন্দির। তাই গত কয়েক বছর সেই গ্রামগুলিতে দুর্গাপুজো হয়নি। একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল পারলালপুর গ্রামেও। পাড় কাটতে কাটতে গঙ্গা চলে এসেছিল একেবারে মন্দিরের সামনে। যদিও মন্দিরের সামনের পাড় বাঁধাই হওয়ায় খানিকটা যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল এলাকাবাসী। তাঁদের স্বস্তি এখনও বজায় রয়েছে। তবে এবার গঙ্গা অনেক শান্ত। শুধুমাত্র এলাকার গোপাল মণ্ডলপাড়ায় এবার সামান্য ভাঙন হয়েছে। এছাড়া আর কোথাও গঙ্গা ছোবল মারেনি। তাই এবার এলাকার সবাই দুর্গাপুজো করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। পারলালপুর দুর্গামন্দিরের সম্পাদক লক্ষ্মণ সরকারের আশা, এবার নিশ্চয়ই মন্দিরে দুর্গাপুজো হবে।

পারঅনুপনগর স্পোর্টস ক্লাবের সদস্য উত্তমকুমার সিংহ জানাচ্ছেন, দুবছর আগেই গঙ্গার তীব্র ভাঙনে গ্রামের দুর্গামন্দির তলিয়ে গিয়েছে নদীতে। তারপর থেকে পুজো বন্ধ ছিল। কিন্তু এবার অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে পুজো করা হবে। তবে পুজোয় আগের সেই জৌলুস এখন আর থাকবে না। আগে নিজেদের ঘরবাড়ি ছিল। ক্লাবের নিজস্ব মন্দির ছিল। সেসব কথা মনে পড়লে এখনও বুকের ভিতরটা কেমন যেন মুচড়ে ওঠে। সবই দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়।

এদিকে লক্ষ্মণবাবু বলছেন, আগে পারলালপুর দুর্গামন্দিরে ধুমধাম করে পুজো করা হত। কিন্তু টানা কয়েক বছরের গঙ্গা ভাঙনে মানুষ সর্বস্ব খুইয়ে এখন পরগাছার মতো বসবাস করছে। তাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা যায় না। কিন্তু গ্রামে যদি একটা দুর্গাপুজো না হয়, তবে ছেলেমেয়েরা যাবে কোথায়? তাই গ্রামের কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেভাবেই হোক, এবার মন্দিরে পুজো করতেই হবে। পাশের গ্রাম থেকে শিল্পীরা মন্দিরে এসে দেবীপ্রতিমা গড়ার কাজ শুরু করে দিয়েছেন। মা গঙ্গা সহায় থাকলে এবার পুজো হবেই।