মন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পরেও সক্রিয় বালি-পাথর মাফিয়ারা

768

শিলিগুড়ি ও ফাঁসিদেওয়া : মন্ত্রীর হুঁশিয়ারিই সার। শিলিগুড়ি মহকুমার বিভিন্ন নদী থেকে অবাধে বালি-পাথর পাচার চলছেই। বালাসন হোক বা মহানন্দা, মানঝা হোক বা ডুমুরিয়া অথবা মেচি, কোনও নদীই বালি মাফিয়াদের থাবা থেকে সুরক্ষিত নয়। প্রত্যেকটি নদী থেকেই দিন-রাত এক করে বালি-পাথর তুলে এ রাজ্যের পাশাপাশি বিহার, অসমে পাচার করা হচ্ছে। নদী থেকে বড় পাথর তুলে সেগুলি ভাঙার জন্য প্রচুর বেআইনি ক্রাশারও গজিয়ে উঠেছে। অভিযোগ, প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা, সব পক্ষের মদতেই এই কারবার চলছে। প্রতিদিন মহকুমাজুড়ে কোটি টাকার বেআইনি বালি-পাথরের কারবার চললেও প্রশাসন নাকি কিছুই জানে না। কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থাই নেয় না প্রশাসন। মাসে দু-একবার লোক দেখানো অভিযান হলেও দুএকটি গাড়ি ধরে নিয়ে গিয়ে আবার সওদা করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছেড়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ, শাসকদলের নেতাদের থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে মাসোহারা দিয়ে এই কারবার চলে। তাই সবাই সব দেখলেও মুখ বন্ধ রাখে। দার্জিলিংয়ের জেলা ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিক নিবিল ঈশ্বরারী বলেন, প্রত্যেকটি ব্লক প্রশাসনকেই বেআইনি কারবার রুখতে কড়া পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া রয়েছে। তবুও কীভাবে বালি-পাথর চুরি হচ্ছে, তা দেখছি।

শিলিগুড়ি শহর, শহরতলি এবং মহকুমার বিভিন্ন ব্লকের নদীগুলি থেকে রোজ গাড়ি গাড়ি বালি-পাথর তুলে নিয়ে যাচ্ছে পাচারকারীরা। কোনও কোনও নদীর ঘাট লিজ নেওয়া রয়েছে ঠিকই, কিন্তু লিজের শর্তাবলি পুরোপুরি অমান্য করে নদীর যেখানে-সেখানে বিরাট গর্ত করে বালি-পাথর তুলে নেওয়া হচ্ছে। যে কোনও সেতুর ২০০ মিটারের মধ্যে বালি-পাথর তোলা আইনত নিষিদ্ধ। তবুও বিভিন্ন সেতু সংলগ্ন এলাকা থেকেও বালি-পাথর চুরি করা হচ্ছে। গাড়ি, আর্থমুভার দিয়ে যেভাবে বালি তোলা হচ্ছে, তাতে দেখে মনে হয় যেন মাঝনদীতে গাড়ির মেলা বসেছে।

- Advertisement -

নদী থেকে বালি-পাথর পাচার নিয়ে এর আগে সরব হয়েছিলেন পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেব। তিনি জানিয়েছিলেন, প্রত্যেকটি নদীকে নষ্ট করে দিনের পর দিন কিছু অসাধু লোক বালি-পাথর পাচার করছে। দার্জিলিং এবং জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসনকে দ্রুত অবৈধ কারবার বন্ধ করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তারপরেও শিলিগুড়ি থেকে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল যাওয়ার সময় নৌকাঘাটে মহানন্দা সেতুতে দাঁড়ালেই দেখা যাবে, আর্থমুভার নামিয়ে নদী থেকে গাড়িতে বালি তোলা হচ্ছে। একই অবস্থা নকশালবাড়ির নেপাল সীমান্তের মেচি নদী, খড়িবাড়ির ডুমুরিয়া নদী, নকশালবাড়ির মানঝা, ফাঁসিদেওয়ার চেঙ্গা নদী সহ মহকুমার সমস্ত নদীতেই। বিধাননগরের পরে উত্তর দিনাজপুর জেলার সীমানায় মহানন্দায় মোটা পাইপ বসিয়ে পাম্পসেটের সাহায্যে নদীগর্ভ থেকে বালি তুলে নেওয়া হচ্ছে। এই বালি বিহার এবং অসমে বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা লুটছে একটি চক্র।

অন্যদিকে, বুড়ি বালাসন নদীবক্ষ অবৈধভাবে খনন করে পাচার হচ্ছে বালি-পাথর। তিনশোর বেশি লরি এই কাজে ব্যবহার হচ্ছে। প্রতিদিন ১০ লক্ষ টাকার কারবার চলছে। সেতুর একেবারে নীচ থেকে বালি-পাথর তোলায় সেটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। ২০১৪ সালে এসজেডিএর তৈরি করা সেতুটির পিলার মাত্র ৬ বছরে হেলে গিয়েছে, সিমেন্ট খসে রড বেরিয়ে পড়েছে। মাসখানেক আগে অবৈধ খননের ফলে তারবান্ধার শিবডাঙ্গি এলাকায় একটি সেতু ভেঙে পড়েছিল। ফলে এলাকাবাসী উদ্বিগ্ন। তারবান্ধার বাসিন্দা ফণী রায় জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনে অভিযোগ জানানো হলেও কাজ হয়নি। কামারগছের বাসিন্দা চিরঞ্জিৎ রায় জানিয়েছেন, ওই সেতু দিয়ে রোজ হাজার পাঁচেক মানুষ যাতায়াত করেন। কিন্তু অবৈধ খননের ফলে সেতুটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রশাসন বিষয়টি জানলেও পদক্ষেপ করছে না। তাই বালি পাচার রুখতে তারা নিজেরাই রাস্তায় বাঁশের ব্যারিকেড দিয়েছেন।

ফাঁসিদেওয়ার বিডিও সঞ্জু গুহমজুমদার জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ এসেছে। বিএলএলআরও-কে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে আবার অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হবে। ডিএসপি (গ্রামীণ) অচিন্ত্য গুপ্ত জানিয়েছেন, নদীটি বাগডোগরা থানা এলাকায় পড়ে। তবে বিএলএলআরওর সঙ্গে আলোচনার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তবে বাগডোগরা থানার এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, নদীটি ফাঁসিদেওয়া থানা এলাকায় পড়ে। ফাঁসিদেওয়ার বিএলএলআরও ললিত থাপা ফোন না তোলায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।