করোনা আবহে ভক্তদের ঢোকা নিষিদ্ধ দেবীনগর কালীবাড়িতে

272

রায়গঞ্জ: দেবীনগর কালীবাড়িতে এবার মন্দির প্রাঙ্গণে ভোগ সহ অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে ভক্তদের ঢোকা নিষিদ্ধ করল মন্দিরের ট্রাস্টি কমিটি। শুধুমাত্র বাঁশের ব্যারিকেডের মধ্যে চলমান অবস্থায় মায়ের দর্শণ করে চলে যেতে হবে ভক্তদের। ব্যারিকেডের ভিতরে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। মায়ের পুজোর জন্য বাইরে থেকে কেউই কোনও কিছু দিতে পারবেন না। আলাদা আলাদা নামে পুজো দেওয়া হবে না। গতবারের মত এবারও বন্ধ থাকছে বলিপ্রথা। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে  জানান ট্রাস্টি কমিটির তরফে গৌড় শঙ্কর মিত্র।

পাশাপাশি এবার দেবীনগর স্পোর্টিং অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত ৪৬ তম উত্তরবঙ্গ ভিত্তিক দীপাবলি উৎসব বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আয়োজক সংস্থা। আয়োজক সংস্থার সম্পাদক কাউন্সিলার  প্রসেঞ্জিৎ সরকার জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনও মতেই অনুষ্ঠান করা যাবে না। দীর্ঘ ৪৫ বছর অনুষ্ঠানের পর এবার প্রথম এখানকার ঐতিহ্যবাহী দীপাবলি উৎসব বন্ধ থাকছে। সকলের কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত আমাদের।

- Advertisement -

প্রসঙ্গত, দেবীনগর কালীবাড়ি প্রাঙ্গণে দীপাম্বিতা কালিপুজোর দিন সূর্য ডোবার পরে গড়া হয় মায়ের প্রতিমা। রাতে পুজো শেষ হওয়ার পর সূর্যদয়ের আগে বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতিমা। এই জেলার পাশাপাশি মালদা, দক্ষিণ দিনাজপুর ও পার্শ্ববর্তী বিহার রাজ্য থেকে ভক্তরা পুজো দিতে আসেন। হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে। এমন এক অদ্ভুত নিয়মে বছরের পর বছর পূজিতা হয়ে আসছেন এখানকার কালিবাড়ির মা কালী।

কথিত আছে, দিনাজপুরের গোপালপুর এলাকার রক জমিদার এই পুজোর সূচণা করেন। ওই জমিদার এই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় নাকি তাঁর গাড়ি আটকে যায়। গাড়িতেই তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। ওই রাতেই তিনি মা কালীর স্বপ্নাদেশ পান। এরপরেই সেখানে মন্দির গড়ে তুলে পুজো শুরু করেন। সন্ধ্যাবেলা প্রতিমা গড়ে পুজোর পর ভোরের আলো ফোটার আগে বিসর্জন দেওয়ার নির্দেশ স্বপ্নাদেশে পান। সেই নিয়ম মেনে আজও একই ভাবে পুজো হয়ে আসছে এখানে। এখানকার পুজোর জন্য কোনও চাঁদা তোলা হয় না। ভক্তদের দানে এবং পুজোর দিনে দানপত্রে যে অর্থ জমা হয় তা দিয়ে পুজোর আয়োজন করা হয়।

মন্দিরের সেবায়েত তপন চক্রবর্তী জানান, বছরের পর বছর একই নিয়মে পুজো হয়ে আসছে। এখানকার মা দিনের আলো দেখেন না। বহু ভক্তের সমাগম হয় পুজোর দিন। তবে এবছর করোনার কারণে অনেক বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে আমাদের প্রত্যেককে। ট্রাস্টি কমিটির তরফে গৌড় শঙ্কর মিত্র জানান, এবছর করোনার কারণে যে সমস্ত বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে ভক্তদের তা মাইকিং করে এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে ফ্লেক্স টাঙিয়ে জানিয়ে দেওয়া হবে।

পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমেও আমরা জানিয়ে দেব। দূর দূরান্ত থেকে ভক্তরা এসে যাতে ভিড় না জমায় আমরা সেই আবেদন জানাবো। এবারে প্রত্যেকের উদ্দেশে আমরা পুজো দেব, তাই আলাদা ভাবে পুজো দেওয়া যাবে না পুজোর দিন। তিনি আরও বলেন, এখানে পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। কোনও অন্ন ভোগ হয় না। ফল, মিস্টি, সুজি, লুচি দিয়ে ভোগ সাজিয়ে দেওয়া হয়।

এখানে বলিপ্রথা থাকলেও মূল পুজোতে বলি হত না। ভোরের আলো ফোটার আগে বিসর্জনের পর ভক্তরা আলাদা আলাদা ভাবে বলি দিয়ে পুজো দিত। এরসঙ্গে মূল কমিটির পুজোর কোনও সম্পর্ক ছিল না। তবে গতবার থেকে বলিপ্রথা বন্ধ রয়েছে। শিক্ষাবিদ, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি সহ সকলের মতামত নিয়ে পুজোর দিনে এখানকার বলি বন্ধ করা হয়েছে। ট্রাস্টি কমিটির সদস্য গৌতম দাস বলেন, এখানকার পুজো সকলের নজর কাড়ে। সারাবছর এখানে পুজো চলে। করোনা ভাইরাসের কারণে নিয়ম মেনেই পুজো দেন ভক্তরা। সারাবছরই দেবী পূজিতা হন খোলা আকাশের নীচে। কারণ মন্দিরের উপর কোনও আচ্ছাদন নেই।

কালীমন্দিরের পাশেই আয়োজন করা হয় দীপাবলি উৎসবের। ফলে জমজমাট থাকে মন্দির ও অনুষ্ঠান মঞ্চ। দীপালি উৎসবের সাংস্কৃতিক  কমিটির সম্পাদক সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় জানান, উৎসব মানেই বহু মানুষের সমাগম। এই সময় মানুষের সমাগম হলে আরও সংক্রমণ ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই সাধারণ মানুষের কথা ভেবে এবছর দীপাবলি উৎসব বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সকলেই এ ব্যাপারে সহমত পোষণ করেছেন। এই সিদ্ধান্তে কচিকাঁচাদের সঙ্গে আমাদের মনও ভালো নেই, কিন্তু কিছু করার নেই। রায়গঞ্জের চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক সহ বিশিষ্টজনেরা আয়োজক সংস্থার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন।