তিন দিনের ধর্নার পর অবশেষে স্বামীর বাড়ির অধিকার পেলেন স্ত্রী

1534
সাহাড়াতলায় স্বামীর বাড়িতে ধর্না অবস্থানে নাসিমা খাতুন। ছবি - শেখ পান্না।

সামসী, ১৬ সেপ্টেম্বরঃ তিন দিন ধরে ধর্নার পর অবশেষে স্বামীর বাড়ির অধিকার পেলেন স্ত্রী। স্বামীর অধিকারের দাবিতে শ্বশুরবাড়িতে সোমবার থেকে টানা তিন দিন ধরে ধর্না অবস্থানে বসেন এক গৃহবধূ। মালদা জেলার রতুয়া-১ ব্লকের সামসীর সাহাড়াতলায় ঘটনাটি ঘটেছে। ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এরকম ঘটনা সামসী এলাকার মানুষ কোনওদিন দেখেননি। তাই ওই গৃহবধূর ধর্না অবস্থান দেখতে এলাকার পুরুষ-মহিলা মিলিয়ে প্রচুর মানুষের ভিড় জমিয়েছিলেন। অবশেষে চাপে পড়ে স্বামীর বাড়ির লোকজন নাসিমাকে বুধবার দুপুরে বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নেন। বাড়িতেও তুলে নেওয়া হয়েছে। স্বামীর অধিকারের দাবিতে টানা তিন দিন ধর্নার পর জয় হল নাসিমার। আর তাতেই খুশির হাওয়া এলাকায়। গ্রামের অনেকেই জানান, এভাবে ধর্নায় না বসলে হয়তো শ্বশুরবাড়ির দাবি আদায় সম্ভব হত না।

খবর পেয়ে বুধবার এলাকাবাসী সকলে ছুটে যান সাহাড়াতলায়। নাসিমা খাতুন স্বামীর বাড়ির সামনে মেঝেতে ধর্নায় বসেছিলেন। নাসিমা খাতুন জানিয়েছেন, তাঁর বাবার বাড়ি রতুয়া-২ ব্লকের সম্বলপুর টাল গ্রামে। তিনি সামসী সীতাদেবী গার্লস স্কুলে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশুনা করেন। পড়াশুনার সূত্রে তিনি সামসীতে এক মেসে থাকতেন। তাঁরপর গত আট মাস আগে হঠাৎ একদিন সামসীর সাহাড়াতলার যুবক মহম্মদ সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়। প্রথম আলাপেই একে অপরের ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়াও হয়ে গিয়েছিল।

- Advertisement -

নিয়মিত ফোনে কথা হতে থাকে। দীর্ঘ পাঁচ মাস প্রেমের পর দু’মাস আগে ২১ জুলাই মুসলিম বিবাহ আইনে ও শরীয়ত মতে বিয়ে করে তাঁর স্বামী সাহাড়াতলার বাড়িতে নিয়ে আসেন। নাসিমার কাছে বিয়ের সার্টিফিকেটও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু, সাহেবের পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ে মানেননি। বরং, তাঁদের বাড়িতে উঠতে না দিয়ে একরকম তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। নিরুপায় হয়ে সাহেব নতুন বউ নিয়ে সামসীর কুশরাক্ষা গ্রামে এক বাড়িতে প্রায় পনেরো দিন থাকেন। তারপর সেখান থেকে সামসীর পুলিশ ফাঁড়ির সামনে এক ভাড়া বাড়িতে স্বামী ও স্ত্রী থাকতে শুরু করেন। কুরবানী ঈদে সম্বলপুর টাল বাবার বাড়িতে স্বামীকে নিয়ে যান। ঈদের উপহার হিসেবে নাসিমার বাবা নতুন জামাই সাহেবকে একটি সোনার আংটি ও নগদ ২০ হাজার টাকা দেন।

নাসিমা খাতুন আরও জানান, সামসীতে ভাড়া বাড়িতে থাকা কালীন আমাকে রেখে দু-চারদিনের জন্য ভাড়া বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। ওই কয়েকদিন নাসিমার ফোনও ধরেননি সাহেব। কয়েকদিন পর ফিরে এসে তাঁকে তালাক দেওয়ার কথা বলেন স্বামী। স্বামী তাঁকে জানায়, যেহেতু এই বিয়ে বাড়ির লোকজন মেনে নেয়নি তাই নাসিমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না। দিন পনেরো আগে সাহেব তাঁকে সম্বলপুর টাল গ্রামে গৃহবধূর বাবার বাড়িতে রেখে আসেন।

নাসিমা খাতুনের অভিযোগ, বাবার বাড়িতে রেখে আসার পর স্বামী আর যোগাযোগ রাখেননি। শ্বশুরবাড়ির গ্রাম সাহাড়াতলা থেকে জানতে পারি সাহেব কালিয়াচকে রেখেই ফের বিয়ে করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাহেবের বিয়েও ঠিক হয়ে গেছে বলে নাসিমা জানান। এই খবর পাওয়া মাত্রই স্বামীর অধিকারের দাবিতে তিনি শ্বশুরবাড়ি সাহাড়াতলায় ছুটে আসেন। শ্বশুরবাড়িতে উঠতে গেলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন বাঁধা দেন। তখন স্বামীর অধিকারের দাবিতে শ্বশুরবাড়িতে ধর্না অবস্থানে বসে পড়েন। ধর্নায় বসার আগে বিষয়টি সামসী ফাঁড়ির পুলিশকেও জানানো হয়েছিল। নাসিমা খাতুন সাফ জানায়, পুরোপুরি স্ত্রীর মর্যাদা এবং শ্বশুরবাড়িতে প্রবেশাধিকার না পাওয়া পর্যন্ত তিনি ধর্না অবস্থান চালিয়ে যাবেন। স্বামীর বাড়িতে উঠতে না পেলে স্বামীর বাড়ির সামনেই মারা যাবেন বলে হুমকি দেন। স্ত্রীর নাছোড়বান্ধা মনোভাবেই অবশেষে হার মানে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। বুধবার দুপুরেই সাহেবের বাড়ির সদস্যরা নাসিমাকে মেনে ঘরে তুলে নিয়েছেন।

এদিকে, ঘটনার পর থেকেই স্বামী সাহেব আলি বাড়ি থেকে পলাতক। তবে সাহেবের এক দাদা শেখ সাদ জানিয়েছেন, ভাই কোথায় বিয়ে করেছে, তা তাঁরা বাড়ির আর কেউ জানতেন না। ভাইয়ের কাছ থেকে সব জেনে শুনে নাসিমাকে বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে। এদিকে, মেয়ের পরিবারের লোকজনও ভীষণ খুশি। চাঁচলের এসডিপিও সজলকান্তি বিশ্বাস বলেন, ঘটনাটি শুনেই শুরু থেকেই সামসী ফাঁড়ি পুলিশকে বিষয়টি দেখতে বলা হয়েছিল। বুধবার দুপুরের দিকে ওই গৃহবধূকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন বাড়িতে উঠিয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রে খবর।