বিশেষভাবে সক্ষম খুশবু সরকারি সাহায্য পায়নি

মুরতুজ আলম, চাঁচল : খুশবু খাতুন। বয়স বছর পনেরো। জন্মের পর থেকেই কথা বলতে পারেন না খুশবু। পারেন না হাঁটাচলা করতে। মানসিক ও শারীরিকভাবে বিশেষভাবে সক্ষম। স্বভাবতই মেয়েকে নিয়ে লকডাউনের মধ্যে বিপাকে তাঁর পরিবার। অসহায় এই পরিবারের বাড়ি চাঁচল-১ ব্লকের নজরুলপল্লিতে। খুশবুর বাবা নাহিদ হাসান পেশায় দিনমজুর। মা গুড্ডি খাতুন সাধারণ গৃহবধূ। তাঁদের একমাত্র মেয়ে খুশবু খাতুন। জন্মলগ্ন থেকেই মেয়েকে নিয়ে অভাবের মধ্য দিয়ে দিন কাটছে তাঁদের। অন্যান্য দিন কোনওভাবে চলে গেলেও লকডাউনের কারণে কর্মহারা হয়েছেন নাহিদ সাহেব। যার ফলে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে তাঁকে।

লকডাউনে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন নাহিদ সাহেব। সংসারে আয় নেই। দুমুঠো খাবার জোগার করতে হিমসিম খাচ্ছেন তিনি। কিন্তু সংসারের শত ব্যস্ততার মাঝেও ভুলে যাননি বিশেষভাবে সক্ষম একমাত্র মেয়েকে। ঠিকমতো কথা বলতে পারে না। হাঁটতেও পারে না। নিজের হাতে খাবার তুলে খেতেও পারে না। মানসিকবাবে ভেঙে পড়া মেয়েকে নিয়ে মাঝেমধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মা গুড্ডিদেবী। মেয়েকে খাওয়ানো, স্নান করানো, চুল বাঁধা, ঘুরতে নিয়ে যাওয়া সবই করে যাচ্ছেন সংসারের কাজের ফাঁকে। গুড্ডি খাতুন বলেন, শত কষ্টের মধ্যে দিয়ে দিন পার হলেও এখনও পর্যন্ত মেলেনি খুশবুর শংসাপত্র। যার কারণে মিলছে না কোনও সরকারি ভাতা। এমনকি কোনও সুযোগসুবিধাও মেলেনি। নেই জন্মের শংসাপত্র। যার ফলে আধার কার্ড হয়নি। বিষয়টি পঞ্চায়েত, ব্লক প্রশাসনকে একাধিকবার জানিয়ে কোনও লাভ হয়নি। বারবার ঘুরেও পঞ্চায়েত থেকে মেয়ের শংসাপত্র পাওয়া যায়নি। কবে পাওয়া যাবে, তারও সঠিক উত্তর নেই।

- Advertisement -

অসহায় মা আরও বলেন, মানসিক ও দৈহিক প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মেছে খুশবু। তাই তার দিকে তাকানোর কোনও লোক নেই। নেতা থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত প্রধানও সহযোগিতার হাত বাড়াননি। ১৫ বছর ধরে বদলেছে চেয়ার, বদলেছে নেতা, মন্ত্রী, প্রধান। কিন্তু এত বছর ধরে কষ্টকর জীবনযাপন এতটুকু বদলায়নি। দারিদ্রতাকে সঙ্গী করে কেটে গিয়েছে ১৫টা বছর। শুধু মিলেছে ফাঁকা প্রতিশ্রুতি। নাহিদ হাসান বলেন, অভাবের তাড়নায় এখন মেয়েকে চলাচল করার জন্য একটা হুইলচেয়ারও কিনে দিতে পারছি না। মেয়ে যখন ৫ বছর বয়স ছিল তখন তাকে একটি গাড়ি কোনওমতে কিনে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেটি বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। হুইলচেয়ারের জন্য পঞ্চায়েত ও ব্লক প্রশাসনকে বলেও কাজ হয়নি। এদিকে মেয়ে সরকারি শংসাপত্র, ভাতা কিংবা সামান্য একটা হুইলচেয়ারের জন্য পঞ্চায়েত, ব্লক, বিধায়কের কাছে দরবার করেও কিছু জোটেনি।

গুড্ডি খাতুন জানান, মেয়েকে প্রতিবন্ধী স্কুলে পড়ানোর ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। সে কোনওরকম বাড়িতে বসেই এ, বি, সি, ডি শিখেছে। কথা বের হয় না ওর মুখ দিয়ে তাই পড়াশোনার ইচ্ছা থাকলেও অধরাই থেকে গিয়েছে। চেষ্টা চালিয়েছে বারবার। কলম তুলেছে হাতে। কিন্তু তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শারীরিক অক্ষমতা। সেই কারণে হাত দিয়ে আর লেখা হয়ে ওঠেনি। তবে নিজের মতো করে আঁকতে পারে। তাই খুশবুর জীবনে হাত-পা বলতে শুধুই তার মা। নিজের শুধু রয়েছে দেখার শক্তি। তাছাড়া কোনও শক্তিই নেই। স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন ওরফে জনি বলেন, খুশবুর পরিবারের অবস্থা খুব শোচনীয়। আমরা যতটা পারছি সাহায্য করছি। ঘটনার কথা স্বীকার করে পঞ্চায়েত উপপ্রধান উৎপল তালুকদার বলেন, ঘটনাটি শুনেছি। আমরা দেখছি কী করা যায় খুশবুর জন্য।

এ ব্যাপারে চাঁচল-১ ব্লকের উন্নয়ন আধিকারিক সমীরণ ভট্টাচার্য জানান, বিষয়টি আমি প্রথম জানতে পারলাম। তবে ওই অসহায় পরিবারটি আমার কাছে সাহায্যের জন্য আসেননি কোনওদিন। আমি সবরকমভাবেই তাঁদের পাশে থাকব। সবরকম সরকারি সাহায্য পাওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করব। এলাকার জেলা পরিষদ সদস্য সামিউল ইসলাম বলেন, অসহায় পরিবারটিকে একটি পাকাঘর ও কিছু আর্থিক সাহায্যের কথা ভাবা হচ্ছে।