ধর্মের বেড়াজাল ছিঁড়ে ভালোবাসার গান শোনালেন কেন্দ্রা-বাসন্তী

569

নাগরাকাটা, ১২ অগাস্ট : নাগরাকাটা চা বাগানের শ্রমিক কেন্দ্রা ওরাওঁ বাসন্তীকে জীবনসঙ্গী করবেই এমন পণ নিয়ে ফেলেছিলেন। কয়েকমাস আগে বিশেষভাবে সক্ষমদের একটি সভায় বাসন্তীকে এক ঝলক দেখেই তাঁর ভালো লেগেছিল। সেই থেকে শুরু ওঁদের মন দেওয়ার পর্ব। সোমবার চার হাত এক হল। পাত্র-পাত্রী দুজনেই মূক ও বধির। ধর্মের বেড়াজালও ওঁরা হেলায় ছিঁড়ে ফেলেছেন ভালবাসার অমোঘ অস্ত্রকে হাতিয়ার করে। কেন্দ্রা খ্রিস্টান, অন্যদিকে ভগত্পুর চা বাগানের বাসন্তী মাঝি হিন্দু। বিয়ে হয়েছে দুই মতেই। সবকিছু দেখে শুনে আপ্লুত ব্লক প্রশাসনের কর্তারাও। বিডিও স্মৃতা সুব্বা বলেন, এই কাহিনীর মধ্যে এত রসদ লুকিযে আছে যে প্রতিটির আলাদা আলাদা ব্যাখা করলে অনেক সময় লেগে যাবে। দুজনে সুখে শান্তিতে জীবন কাটাক, ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনাই করছি।

নাগরাকাটা চা বাগানের বছর পঁয়ত্রিশের যুবক কেন্দ্রা কীটনাশক স্প্রের শ্রমিকের কাজ করেন। জন্ম থেকেই মূক-বধির কেন্দ্রা মাস চারেক আগে ভগত্পুর চা বাগানের চুন্দা লাইন নামে একটি শ্রমিক মহল্লার বাসন্তী মাঝিকে প্রথম দেখেন আদর্শ বিকলাঙ্গ কল্যাণ সোসাইটির একটি সভায। এলাকার বিশেষভাবে সক্ষমরাই ওই সংস্থার সদস্য। সেদিনই বাসন্তীকে দেখে তাঁর মনে ধরে যায়। বিষযটি ইশারায জানান ঘনিষ্ঠদেরও। কেন্দ্রার প্রেম নিবেদনের বার্তা পৌঁছায় প্রায় সমবয়সী ওই যুবতির কাছেও। সম্পর্ক গড়তে ইতিবাচক সাড়া আসে তাঁর কাছ থেকেও। এরপর আসরে নামেন ওই সংস্থা সহ আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য রাজ্য সরকারের উদ্যোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গঠিত কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট রিপ্রেজেনটিভস (সিডিআর)-এর সদস্যরা।

- Advertisement -

গত জুলাই মাসে মাংনি বা পাটিপত্র হয়। সেদিন বাসন্তীদের ভগত্পুরের বাড়িতে বাগদান পর্বের অনুষ্ঠানটি ছিল হিন্দুমতে। বাসন্তীরা এতই দুস্থ যে পাড়া প্রতিবেশীদের সাহায্যে সেদিন পাত্রপক্ষকে আপ্যায়ন করা হয়। বাসন্তীর বাবা নেই। বাড়িতে রোজগেরে বলতে একমাত্র ভাই বিরজু। তিনিও বিশেষভাবে সক্ষম। একটি রেশন দোকানে কর্মচারীর কাজ করেন। সোমবার নাগরাকাটা চা বাগানের গির্জায় খ্রিস্টমতে বাসন্তীকে জীবনসঙ্গী করে নেন কেন্দ্রা।

কেন্দ্রার বাড়িতে প্রীতিভোজের আয়োজনও ছিল। মেনুতে ছিল ভাত, মুরগির মাংস, ফ্রায়েড রাইস, দই, মিষ্টি। বাসন্তীর বৃদ্ধা মা কৌশল্যা বলেন, ‘মেযে সুখে ঘর করুক এটাই একমাত্র প্রার্থনা। আজ আমি খুব খুশি।’ পুত্রবধূ পেয়ে উচ্ছ্বসিত কেন্দ্রার বাবা ও মা। তাঁরা বলেন, ‘ছেলের বউয়ের মুখ দেখে যেতে পারলাম। এর চেয়ে সৌভাগ্যের আর কীই বা হতে পারে’। মিটিং এর চেয়ার থেকে এই সম্পর্কে ছাদনাতলায় নিযে যেতে যার অবদান অনস্বীকার্য সেই সিডিআর-এর সদস্য রতন মাঝি বলছেন, ‘ঠিক যেন সিনেমার মতো। ওদের ভালোবাসা অক্ষয় হোক। মেয়েটি যাতে সরকারি রূপশ্রী প্রকল্পের টাকা পায় সেই চেষ্টা করছি।’

ছবি – সোমবার নাগরাকাটা চা বাগানে বিয়ের অনুষ্ঠানে কেন্দ্রা ও বাসন্তী।

তথ্য ও ছবি- শুভজিৎ দত্ত