মুখে হাসি, তবে মন ভালো নেই বাঁশিওয়ালা ফিরোজের

শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি  : বাঁশির আওয়াজ তিনি শুনতে পান না। কিন্তু এই বাঁশিই তাঁর জীবিকার মূল সুর। শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কয়লাডিপোর বাসিন্দা বছর ত্রিশের যুবক মহম্মদ ফিরোজ বিশেষভাবে সক্ষম। তিনি কথা বলতে পারেন না। কানেও শোনেন না। এইসব প্রতিবন্ধকতা দূরে সরিয়ে কাঁধে বাঁশির সম্ভার নিয়ে ঘুরে বেড়ান শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।

ফিরোজ জন্ম থেকেই মূক ও বধির। ছোট থেকেই পৃথিবীকে অন্যরকমভাবে দেখতে অভ্যস্ত। কানে শুনতে না পেলেও বন্ধুবান্ধবের বাঁশি বাজানো দেখে নিজের মতো করে বাঁশি বাজানো শুরু করেন। ধীরে ধীরে এই বাঁশির প্রতি একটা ভালোবাসাও জন্মে যায়। পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার চাপে পড়াশোনা হয়নি। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বাঁশির সম্ভার নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। এরপর কেটেছে দশবছর। কিন্তু বাস্তবের পথ বড় কঠিন। হাতের ইশারায় সে কথাগুলিই ফিরোজ বলছিলেন। হাতের ইশারায় বলার চেষ্টা করলেন, এই বাঁশিই তাঁর সম্পদ। কিন্তু অনেকেই তাঁর কথা না বুঝে চলে যায়। অনেকে টাকা না দিয়ে বাঁশি নিয়ে চলে যায়। পকেট থেকে কিছু পয়সা বের করে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, আগের মতো বাচ্চাদের আর বাঁশির প্রতি ঝোঁক নেই। তাই আয় সেরকম হয় না।

- Advertisement -

তবে ফিরোজের এই লড়াইটা য়ে আরও কঠিন বাড়িতে থাকা অসুস্থ বোন শেহনাজ খাতুন সেটা বুঝিয়ে দিলেন। ভাইয়ে লড়াইয়ে কথা বলতে গিয়ে তাঁর দুচোখে জল চলে এল। তিনি বললেন, মা আমাদের দুজনের বিয়ে দেওয়ার পর মারা গিয়েছেন। কিন্তু আমার স্বামীও মারা যাওয়ার পর এখন আমি ভাইয়ের কাছেই থাকি। ভাই আমাকে আর ওর বউকে নিয়ে সংসার চালায়। কিন্তু আমার শ্বাসকষ্টের সমস্যা, ভাইয়ের আরও সমস্যা হয়ে উঠেছে। তবুও ভাই মানুষকে নিজের মতো করে বুঝিযেুঝিয়ে বাঁশি বিক্রি করে আমাদের এই পরিবার চালানোর জন্য কোনও সময়ে মুড়ি, কোনও সময়ে হাতে চাল নিয়ে আসে। কেউ আমাদের পাশে দাঁড়ায় না।

ওয়ার্ড কাউন্সিলার পিন্টু ঘোষ বলেন, ফিরোজ কথা বলতে পারে না। কানেও শোনে না। শুধু হাসিমুখে বাঁশি বাজায়। বাঁশির সুরের সঙ্গে তাঁর হাসিটাই যেন সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। যে জিনিসটা শোনার উপর নির্ভর করে, সেই জিনিসটাই সে দিব্যি নিজের মতো বাজিয়ে বিক্রি করছে। দেখতে সহজ হলেও বিষয়টা ইচ্ছাশক্তি ছাড়া হয় না। তিনি আরও বলেন, ফিরোজের বোনের কথা শুনেছি। সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে ফিরোজের পরিবারের পাশে যাতে দাঁড়ানো যায় সেই প্রক্রিয়া আমরা করছি।