ফিল্ম ল্যাবে প্রতিভা অন্বেষণে উত্তরের দিগন্ত

190

দীপ সাহা, শিলিগুড়ি : ছোট থেকেই সিনেমার প্রতি তাঁর অগাধ টান। আর সেই টানেই ছুটে বেড়াচ্ছেন তুফানগঞ্জের দিগন্ত দে। ইতিমধ্যে তথ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র বানিয়ে বাগিয়ে নিয়েছেন দেশ-বিদেশের একাধিক পুরস্কার। এবারে তাঁর লক্ষ্য, দাদাসাহেব ফালকে, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনের দেশে ফিল্ম ল্যাবের প্রসার ঘটানো। জাপান, জার্মানির মতো দেশে যেখানে প্রতিবছর প্রচুর প্রতিভাবান মুখ উঠে আসে এই ফিল্ম ল্যাব থেকে, তেমনই ভারতেও নতুন মুখের খোঁজ করছেন দিগন্ত। তাঁর এই কাজে এগিয়ে এসেছেন হলিউডের কলাকুশলীরাও।

ফিল্ম ল্যাব বা ফিল্মমেকার ল্যাব-এর সঙ্গে আমরা খুব একটা পরিচিত নই। না, এই ল্যাবে সিনেমার পোস্ট প্রোডাকশন কিংবা রিল কাটছাঁট করা হয় না। মূলত প্রতিভাবান চিত্র পরিচালক থেকে কলাকুশলীদের অন্বেষণ করে ফিল্ম ল্যাব। সিনেমা তৈরি থেকে বিতরণ সবটাই যে একটা শিল্প, তা হাতেকলমে শেখানো হয় নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের। পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে ফিল্ম ল্যাব জনপ্রিয় হলেও এ দেশে এখনও পর্যন্ত খুব বেশি ফিল্ম ল্যাব অনুষ্ঠিত হয়নি। একবার কলকাতায় ফিল্ম ল্যাবের আয়োজন হলেও তা খুব সাফল্য পায়নি। কিন্তু তাতে হতাশ নন দিগন্ত। ফিল্ম ল্যাবের ভাবনা ছড়িয়ে দিতে তিনি বদ্ধপরিকর। বলছেন, এটা একটা যুদ্ধের সমান। তবু হাল ছাড়ছি না।

- Advertisement -

আগামী ২১ ও ২২ অগাস্ট উত্তর চব্বিশ পরগনার জেলা সদর বারাসতের হৃদয়পুরের সংহতি গ্রন্থাগার ভবনে বসছে ফিল্ম ল্যাবের আসর। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের স্মরণে চারবছর ধরে বারাসতে আযোজিত হচ্ছে ঋতুরঙ্গম ফিল্ম ফেস্টিভাল-এর। এবারে এই ফেস্টিভালের উপদেষ্টা পদে বসেছেন উত্তরবঙ্গের ছেলে দিগন্ত। প্রথম বছরই একটু অন্যরকম কিছু করার ইচ্ছে ছিল তাঁর। বলছেন, কিয়োটো শহরে ফিল্ম ল্যাবে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। তখন থেকেই ইচ্ছে ছিল, এখানেও এমন একটা কিছু করার। তাই এবারে ঋতুরঙ্গম ফিল্ম ফেস্টিভালকেই ফিল্ম ল্যাবের মঞ্চ হিসেবে বেছে নিলাম।

বিদেশে ফিল্ম ল্যাবে অংশগ্রহণ করার সুযোগ কিন্তু সবার হয় না। নিয়ম মেনে প্রথমে আবেদন করতে হয়। সেই মতো বিচারকরা সবকিছু খতিয়ে দেখেন। খুব প্রতিভাবান অল্প কয়েকজনকে বেছে নেওয়া হয় ফিল্ম ল্যাবের জন্য। তাঁদেরকে সেখানে রেখে চলচ্চিত্র তৈরির পাঠ দেওয়া হয়। একইভাবে দিগন্তদের ফিল্ম ল্যাবেও অংশগ্রহণের সুযোগ থাকছে সীমিত। ল্যাবে থাকছে মোট ছটি বিভাগ- চিত্র পরিচালনা, চিত্রনাট্য রচনা, সিনেমাটোগ্রাফি, চিত্র সম্পাদনা, চিত্র সমালোচনা এবং বিতরণ।

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেরও কিছু প্রতিভাবান মুখ অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন এই ফিল্ম ল্যাবে। মেন্টর হিসেবে থাকছেন কান চলচ্চিত্র উত্সবের ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান দীপ্তি ডিকুনহা, হলিউডের স্ক্রিনরাইটারদের মধ্যে অন্যতম ব্রায়ান হার্ডস্কোভিচ এবং আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন ভাইস ডিন জো প্যাট্রিকা। থাকছেন চারবারের জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী এবং ভারতের প্রথম মহিলা ফিল্ম টেকনিসিয়ান অরুণা রাজে পাতিল। প্রয়াত চিত্র পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ক্যামেরাম্যান তথা স্বনামধন্য চিত্র পরিচালক অসীম বসুও শিক্ষকের ভমিকায় থাকবেন। মাস্টার ক্লাসে শেখাবেন প্রখ্যাত তথ্যচিত্র পরিচালক শীলা দত্ত এবং চলচ্চিত্র গবেষক জ্যোতির্ময় দেবও।

এই লড়াইয়ে দিগন্তের সহচর ঋতুরঙ্গম ফিল্ম ফেস্টিভালের ফাউন্ডার রাহুল বিশ্বাস। তাঁর কথায়, ভারতে হাতেগোনা কয়েকটি ফিল্ম ল্যাব অনুষ্ঠিত হয়। তার মানও তেমন উন্নত নয়। এই পরিস্থিতিতে প্রথম বছরই এতজন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব এই ল্যাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, এটা আমাদের বিরাট পাওনা।

উত্তরবঙ্গ ছেড়ে দক্ষিণে কেন আয়োজন? প্রশ্নটা করতেই দিগন্তের আক্ষেপ, আসলে পরিকাঠামোর অভাবে প্রতিভা থাকলেও উত্তরবঙ্গের ছেলেমেয়েরা তেমন সুযোগ পায় না। এই যেমন আমাকেও ছুটতে হয়েছে দক্ষিণে। তবে, নাড়ির টান কিন্তু রয়ে গিয়েছে। কারণ আমার পরিচালিত তথ্যচিত্র রোডসাইড সায়েন্টিস্টও কিন্তু উত্তরবঙ্গেরই এক প্রতিভাবানকে নিয়ে তৈরি। আমি চাই উত্তরের যাঁরা সিনেমা ভালোবাসেন, সিনেমা নিয়ে ভাবেন তাঁরাও আসুন এই ফিল্ম ল্যাবে।

পরবর্তী পরিকল্পনা কী? দিগন্ত জানালেন, আপাতত তাঁর ধ্যানজ্ঞান সবটাই ফিল্ম ল্যাব নিয়ে এটা শেষ হলে তিনি আবার ছুটবেন ক্যামেরা নিয়ে মেন্টাল ম্যানিফেস্টো-তে পাগল কে সেটা খুঁজে বের করতে হবে তো! কথাটা বলে নিজেই হাসলেন। খোলসা করে বললেন, আরে, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। মেন্টাল ম্যানিফেস্টো আমার প্রথম ফিচার ফিল্ম। আপাতত সেটার কাজ চলছে। আসলে পাগল কাকে বলে, সেটা নিয়ে এই ছবি।