মেয়েকে চিকিৎসক বানানোর স্বপ্নে প্রাণপাত দিলরুবার

সাজাহান আলি, কুমারগঞ্জ : সংসারে সচ্ছলতা ছিল না বলে নিজের পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। পরিবারের চাপে পড়ে তাই খুব কম বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় দিলরুবা খাতুনের। কিন্তু নিজের সেই অধরা স্বপ্নই তিনি পূরণ করতে চান মেয়ের মধ্যে দিয়ে।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তাঁর পড়াশোনা। তাই তিনি চান যাতে যাথায়থ পড়াশোনার মধ্যে দিয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ পায় তাঁর একমাত্র মেয়ে। স্বামী মোস্তাক মণ্ডল ভিনরাজ্যে দিনমজুরের কাজ করেন। আর তিনি স্থানীয় একটি অসরকারি সংস্থায় এলাকার কিছু মহিলাদের স্বনির্ভর করার কাজের সঙ্গে যুক্ত। তবে এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও একমাত্র মেয়ে মুসফিরাক আনজুমকে স্থানীয় একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন দিলরুবা। এত কিছুর পর মনে হতেই পারে যে, এযেন ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখা। কিন্তু তাতেও কুছ পরোয়া নেহি মনোভাব দিলরুবার।

- Advertisement -

কুমারগঞ্জ ব্লকের ৩ নম্বর জাখিরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কালনা গ্রামের বাস তাদের। সেখানেই এক চিলতে বাড়িতে এখন জীবন সংগ্রাম চলছে মা-মেয়ের। নিজের অসরকারি সংগঠনে কাজ করার পাশাপাশি সংসারের জন্য দুপয়সা রোজগারে তিনি প্রয়োজনে যে কোনও ছোট-বড় কাজ পেলে তা নিষ্ঠাভরে করেন। আর্থিক অভাবের কারণে আজ পর্যন্ত নিজেদের বাড়িও তৈরি করতে পারেননি তাঁরা। তাই বিয়ে পর নবছর কেটে গেলেও আজও নিজের বাবার বাড়িতেই আশ্রিতা হিসাবে রয়েছেন দিলরুবাদেবী। তবু মেয়েকে চিকিৎসক বানানোর স্বপ্নে বিভোর তিনি।

কুমারগঞ্জের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে মেয়েকে ভর্তি করেছেন তিনি। আর সে যাতে মায়ের স্বপ্নকে সার্থক করতে পারে সেই লক্ষ্যেই অসাধ্য সাধন শুরু করেছেন তিনি। তবে মায়ের সমস্ত পরিশ্রমের যথাযোগ্য দাম দিয়েছে মেয়ে। স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, মুসফিরাক পড়াশোনায় বেশ ভালো। ২০১৮-২০১৯ বর্ষে সেরা ছাত্রী ও সেরা অভিভাবক হিসাবে স্কুলের তরফে বার্ষিক অনুষ্ঠানে বিশেষ পুরস্কারে সম্মানিত হন মা ও মেয়ে। ২০১৯-২০২০ সালেও নিয়মিত ও অন্যতম সেরা ছাত্রী হিসাবে পুরস্কৃত হয় দ্বিতীয় শ্রেণির মুসফিরাক। ছাত্রীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী স্কুলের অধ্যক্ষ সহ শিক্ষক-শিক্ষিকাই। সকলেই একবাক্যে জানান, ঠিকমতো প্রশিক্ষণ পেলে ভবিষ্যতে সে ভালো জায়গায় যাবে।

কুশমণ্ডির স্কুলে মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার দাযিত্বও মায়েরই। ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন ২২ কিলোমিটার দূরে স্কুলে যাতায়াত করা রীতিমতো দায়। তাই ধারদেনা করে হলেও তিনি একটি পুরোনো স্কুটি কিনেছেন। তাতে করেই প্রতিদিন যাতায়াত করে দুজনে। দিলরুবা জানান, প্রায় রোজদিনই একের পর এক ইন্টারভিউ দিয়ে চলেছি যদি কোনো কাজ পাই। এত কষ্ট স্বীকার করে চলেছেন মেয়ে জন্য লক্ষ্য তো অনেক দূরে। শেষ পর‌্যন্ত লড়াই করতে পারবেন তো? প্রতিবেদকের প্রশ্নে ছলছল চোখে তাঁর উত্তর, আমরা খুব গরিব। দারিদ্র‌্যসীমার নীচে আমাদের বাস। আমাদের তো কোনও কিছুই নেই। আমার ও স্বামীর একমাত্র আশার আলো আমাদের মেয়ে মুসফিরাক। নিজের পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার জন্য আমার বাবা-মা বেশিদূর লেখাপড়া করাতে পারেননি। বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। তাই অন্তত ওকে পড়াশোনা করিয়ে ডাক্তার করাতে পারলে নিজেদের জীবন সার্থক হবে।

তিনি বলেন, জানি এসব পড়তে যেমন অনেক বছর সময় লাগে, তেমনি অনেক অর্থেরও প্রয়োজন । তবু হতদরিদ্র মানুষ হয়ে আমি আশা করি, সব ব্যবস্থা নিশ্চয়ই কোনো না কোনওভাবে হয়ে যাবে। কারণ, শিক্ষা ছাড়া প্রকৃত উন্নতি হতে পারে না বলেই আমি মনে করি। আর আমরা মনে করি ছেলেমেয়ে সমান। তাই তার শিক্ষালাভ ও প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সৎ পথে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতেও কোনও কষ্ট পাই না। দিলরুবার ইচ্ছা, কোনো সহৃদয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যদি সহযোগিতা করতেই হয়, তাহলে তারা যেন আমার মেয়ে পড়াশোনার জন্য সাহায্য করে। কারণ, ওকে প্রথমে মানুষ ও পরে একজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎক হিসাবে দেখতে চাই। কারণ মানুষের চিকিৎসা করার চেয়ে মহৎ কিছুই হয় না।