জিনের রহস্য ও ভ্যাকসিনের ভবিষ্যৎ

434

বর্ষণজিৎ মজুমদার

অধ্যাপক, ক্লিভল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকা

- Advertisement -

কয়েকদিন আগেই লিখেছিলাম, কোভিড সংক্রামিত মানুষদের মধ্যে কারা মারাত্মক অসুস্থ হবেন বা প্রাণসংশয়ে আশঙ্কা থাকবে আর কারা সুস্থ হয়ে উঠবেন বা কারা আদৌ কোনও উপসর্গ ছাড়াই সুস্থ হয়ে উঠবেন- এই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়োজনীয়তা আজ প্রবল। কিন্তু যেহেতু উত্তরটা সোজা নয় এবং চিন্তাভাবনা করতে গেলে গতানুগতিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে, তাই এই সব নিয়ে রাষ্ট্রের, নীতিনির্ধারকদের বা টিভি-র তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের কোনও মাথাব্যথা নেই। প্রশ্ন উঠলে একটাই সোজাসাপ্টা অতি সরলীকৃত উত্তর, দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তারতম্য। কিন্তু কেন তারতম্য, এসবের উত্তর খোঁজা অগ্রাধিকারে পড়ছে না।

শুধু ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারটাই প্রায়োরিটি। কিন্তু সারস কোভ ২ নামক আরএনএ ভাইরাসের ক্ষেত্রে আজকের পাইপলাইনে থাকা কোনও ওষুধ বা ভ্যাকসিন যে চিরস্থায়ীভাবে কাজ নাও করতে পারে সেটা পণ্ডিতদের মাথায় ঢুকছে না। তাই এই অস্বস্তিকর প্রশ্নের উত্তর পাওয়া ভবিষ্যতের কার্যকরী ওষুধ বা ভ্যাকসিনের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠছে। তবুও আশার কথা, এই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে অনেক বিজ্ঞানীই এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছেন আর সেই ভাবনার ফল থেকেই উঠে এসেছে ১৭ জুনের নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন-এ প্রকাশিত হওয়া এই কাজটি। ইটালি, স্পেন, জার্মানি এবং নরওয়ে বিজ্ঞানীরা প্রায় ২০০০ কোভিড সংক্রামিত মানুষের ওপর এক দুঃসাহসিক কাজ করে ফেললেন, জিনোম ওয়াইড অ্যাসোসিয়েশন স্টাডিস অফ দ্য ডিজিজ সিভিরিটি (জিডব্লিউএএস)। এই জিডব্লিউএএস ব্যাপার বাংলায় লেখাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং, তবুও চেষ্টা করলাম।

আমাদের সমস্ত শারীরবৃত্তীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে জিন। সমস্ত জিন আমাদের কোষের নিউক্লিয়াসে থাকা ২৩টা (জোড়া) ক্রোমোজোমের বাড়িতে বাসা বেঁধেছে। ক্রোমোজোম ডিএনএ দিয়ে তৈরি। ডিএনএ তৈরি ছোট ছোট নিউক্লিওটাইডের টুকরো দিয়ে (এ, টি, জি, সি)। এই টুকরোর বিন্যাসের (সিকোয়েন্স) মধ্যেই গাঁথা আছে একেকটি জিন। আমাদের প্রত্যেকের ডিএনএ সিকোয়েন্সের বেশিরভাগটাই এক, কিন্তু তবুও আমাদের ডিএনএ-র মধ্যে খুব সামান্য কিছু জায়গায় অমিলও আছে। এই স্মল ভ্যারিয়েশনের পোশাকি নাম হল, সিঙ্গল নিউক্লিওটাইড পলিমর্ফিজম বা এসএনপি, যাকে বিজ্ঞানী মহলে স্নিপ নামে ডাকা হয়। এই কাজে বিজ্ঞানীরা কোভিড সংক্রামিত ২০০০ জন মানুষের প্রত্যেকের গোটা ডিএনএ-কে সিকোয়েন্স করে প্রায় ৮৬ লক্ষ এসএনপি-কে অঙ্কের ভাষায় বিগ ডাটা অ্যানালাইসিস করে ফেলেছেন। আর ওই পরিশ্রমসাধ্য, জটিল ও দুঃসাহসিক কাজ থেকে এক অভতপূর্ব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কোভিড সংক্রামিত মানুষদের মধ্যে যাঁরা অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে ভেন্টিলেটারে গিয়েছেন বা বেঁচে ফেরেননি তাঁদের ৩ নম্বর ক্রোমোজোমের লোকাসে পাওয়া ছটি জিনে এসএনপি পাওয়া গিয়েছে। প্রত্যেকটা জিন প্রতিরক্ষা কোষের প্রদাহ সৃষ্টিকারী। এই কাজের গ্রহণযোগ্যতা হিসেবে পেশ করা হয়েছে আরও কিছু অঙ্ক কষে বের করা তথ্য।

এই সব জিনে এসএনপি খুঁজে পাওয়ার মানেটা কী দাঁড়াল? বুঝতে গেলে এই ব্যাপারগুলো জানতে হবে :

প্রতিরক্ষা কোষের প্রদাহ এমন একটা ব্যাপার যার ভালো এবং অত্যন্ত খারাপ, দুটো দিকই রয়েছে। প্রদাহকে প্রতিরক্ষা কোষের গুলিগোলা বা বারুদ বলা যেতে পারে, যা প্রতিরক্ষা কোষ ছুড়ে মারে ভাইরাসকে, কিন্তু অনিয়ন্ত্রিতভাবে গুলি চালালে বা কামান দাগলে তাতে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যায় কোষ এবং তার চারপাশের সব কিছু। ঠিক সেই কারণেই এই প্রদাহ সৃষ্টিকারী জিনের নিয়ন্ত্রক বিন্যাসে লাগাম পরানো থাকে। এসএনপি-র উপস্থিতি জিনের বিন্যাস পালটে দেয়। ফলে লাগাম আলগা হয়ে যায়। প্রদাহ হয়ে যায় লাগামছাড়া। কোভিড-১৯এ সংক্রামিত যে সব রোগী ভেন্টিলেটারে গিয়েছেন বা মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁদের বেশিরভাগের কারণই এই লাগামছাড়া প্রদাহ সৃষ্টিকারী সাইটোকাইন স্টর্ম, যার ফল এআরডিএস বা অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম। আবার উলটো দিকের ব্যাপারটাও ভুললে চলবে না। যাঁদের কোনও উপসর্গ নেই অথচ কোভিড পজিটিভ, তাঁদের মধ্যে এমন উপকারী এসএনপি থাকতে পারে, যার ফলে ওই সব মানুষের প্রদাহ অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। এই নিয়ন্ত্রিত প্রদাহ সৃষ্টি করেছে সারস কোভ ২ ভাইরাস আর মানব দেহকোষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ভবিষ্যতের গবেষণা নিশ্চয়ই এর উত্তর দেবে।

এসএনপি-র তথ্য জানার উপকার কী?

১. শুধুমাত্র এক ফোঁটা রক্ত নিয়ে রক্তকোষের জিনোমিক ডিএনএ-র পিসিআর অ্যানালাইসিস বেসড সিকোয়েন্সিং করেই জানা যেতে পারে এসএনপি আছে কি নেই। তার থেকে সংক্রমণের ভয়াবহতার রিস্ক অ্যানালাইসিস করা যেতে পারে।

২. এসএনপি নতুন অনেক জিনের হদিস দিতে পারে, যাকে নির্ভর করে অনেক বেশি কার্যকরী ওষুধের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে।