করোনা-আতঙ্ক দূরে সরিয়ে কিশোরের প্রাণ বাঁচালেন চিকিৎসক

3168

জলপাইগুড়ি: ‘ডাক্তারবাবু আপনার ভগবান। আপনি পারেন আমার ছেলেকে বাঁচিয়ে দিতে। দয়কারে একবার চেষ্টা করুন না।’ করোজোরে অনুরোধ মায়ের। এটা কোনও সিনেমার ডায়লগ নয়। মঙ্গলবার রাতে এটাই শোনা গেল জলপাইগুড়ি শহরের বাবুপাড়ার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে এক মায়ের মুখে। এক মুহূর্ত দেরি না করে স্ট্রেচারে জ্ঞানহীন অবস্থায় শুয়ে থাকা অনুতোষের মুখে নিজের মুখ লাগিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান শহরের চিকিৎসক দেবাংশু দাস। সাড়া দেওয়া মাত্রই সেই চিকিৎসক নিজে স্ট্রেচার ঠেলে অনুতোষকে নিয়ে সোজা নার্সিংহোমের সিসিইউতে। সেখানেও ভেন্টিলেশনে দেওয়ার আগে বেশ কয়েকবার কিশোরের মুখে নিজের মুখ লাগিয়ে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস দিতে থাকেন ডাক্তারবাবু। অনুতোষ কিছুটা স্বাভাবিক হলে তাকে ভেন্টিলেশনে দেওয়া হয়। বর্তমানে এখন অনেকটাই সুস্থ অনুতোষ। করোনা কালে যেখানে চিকিৎসকরাও শারীরিক দুরত্ব বজায় রেখে রোগীর চিকিৎসা করছেন। সেই জায়গায় চিকিৎসক দেবাংশু দাসের মানবিক মুখের সাক্ষী থাকলেন শহরবাসী। ডাক্তারবাবুকে স্যালুট জানালেন শহরবাসী থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাড়িতে টিভি দেখতে দেখতে আচমকাই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র অনুতোষ মুখার্জি। পরিবারের সদস্যরা তড়িঘড়ি তাকে নিয়ে আসেন জলপাইগুড়ি শহরের বাবুপাড়ার একটি নার্সিংহোমে। সেই সময় অনুতোষের খিচুনি শুরু হয়ে যায়। নার্সিংহোমের জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা এক চিকিৎসক অনুতোষকে সিটিস্ক্যান করানোর পরামর্শ দেন। পরিবারের সদস্যরা দ্রুততার সঙ্গে তাকে জেলা হাসপাতাল থেকে সিটিস্ক্যান করিয়ে আনেন। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানোর আগেই শরীর ছেড়ে দেয় অনুতোষ। শ্বাসপ্রশ্বাস একপ্রকার বন্ধ। পালস বিট নেই। আইবল প্রায় স্থির। সেই সময় নার্সিংহোমে ঢুকছিলেন চিকিৎসক দেবাংশু দাস। অনুতোষের মা পলি মুখার্জি ডাক্তারবাবুকে কাছে পেয়ে করোজোরে অনুরোধ করেন তাঁর কোল ফিরিয়ে দেওয়া জন্য। এক মুহূর্ত দেরি না করে অনুতোষের মুখে নিজের মুখ লাগিয়ে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস দিতে শুরু করেন। সেই সঙ্গে সেখানে উপস্থিত থাকা অপর এক ব্যক্তিকে বলেন কিশোরের বুকে হাত দিয়ে চেপে পাম্প করতে। অনুতোষ একটু সাড়া দিতেই তাকে নিয়ে ভেন্টিলেশনে ঢুকিয়ে দেন। অনেক সময় রোগীর প্রাণ বাঁচাতে এই কাজটি ডাক্তারবাবুরা করে থাকেন ঠিকই। কিন্তু করোনা কালে যখন অধিকাংশ চিকিৎসক শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখেই গত সাত মাস ধরে রোগী দেখছেন। সেই জায়গায় করোনা আবহে এই দৃশ্য কার্যত বিরল বলে দাবি অনেকের।

- Advertisement -

দেখুন ভিডিও:

চিকিৎসক দেবাংশু দাস বলেন, ‘ছেলেটির মা যখন আমাকে বলেন, আমি অনুতোষের মধ্যে নিজের সন্তানকে দেখতে পাচ্ছিলাম। করোনা তখন আর আমার মাথায় ছিল না। যেটা করেছি, আমার মনে হয় একজন চিকিৎসক হিসেবে সেটা আমার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।’ এখন অনুতোষ অনেকটাই সুস্থ বলে জানালেন ডাক্তারবাবু।

অনুতোষের মা পলি মুখার্জি বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে ডাক্তারবাবুর মধ্যে আমি ভগবানের দর্শন পেয়েছি। উনি আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। উনি ভগবান।’ করোনাকালে চিকিৎসক দেবাংশু দাসের এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেশের মধ্যে বিরলতম ঘটনা বলে দাবি করেছেন জলপাইগুড়ির একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সভাপতি প্রশান্ত সরকার। প্রশান্তবাবু বলেন, ‘ডাক্তারবাবুর এই কাজের জন্য আমরা তাঁকে স্যালুট জানাই। তাঁর এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য এদিন সংগঠনের তরফে আমরা চিকিৎসক দেবাংশু দাসকে সংবর্ধনা দিয়েছি।’