মেডিকেলে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষোভ বাড়ছে

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : কয়েকদিন আগেই বলা হয়েছিল, উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কোভিডের চিকিৎসা হবে না। করোনার উপসর্গ নিয়ে রোগী এলে তাঁদের কাওয়াখালির সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ইলনেস (সারি) হাসপাতালে ভর্তি রাখা হবে। এই অবস্থায় অন্যান্য রোগীকে মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য আসতে বলা হয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন মেডিকেল কলেজও অলিখিতভাবে কোভিড হাসপাতালের চেহারা নিয়েছে। করোনা পজিটিভ বেশ কিছু রোগী বুধবারও মেডিকেলের বিভিন্ন আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তবে, রাতে তাঁদের কোভিড হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে সারি হাসপাতাল তুলে দেওয়ায় বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে রেফার হওয়া সারির সমস্ত রোগী মেডিকেলে এসে ভর্তি হচ্ছেন। যাঁদের করোনার উপসর্গ চিকিৎসকরা বুঝতে পারছেন তাঁদের আইসোলেশন ওয়ার্ডে বাকিদের রোগ বুঝে বিভিন্ন বিভাগে ভর্তি করা হচ্ছে।

চিকিৎসকদেরই একাংশ বলছেন, উপসর্গহীন প্রচুর রোগী বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি হচ্ছেন। কে নিশ্চয়তা দেবেন যে ওই রোগীদের করোনার সংক্রমণ নেই? হাসপাতাল সুপার ডা কৌশিক সমাজদার বলেন, কী হবে বুঝতে পারছি না। সবই তো দেখছেন। এদিনও আমাদের ১০-১২ জন চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রামিত হয়েছেন। এভাবেই চালাতে হবে। মেডিকেলে সমস্ত রোগী ভর্তি করার জন্য যেভাবে চাপাচাপি করা হয়েছে তা নিয়ে মেডিকেলের চিকিৎসকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি ভয়ানক দিকে যাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করছেন। চিকিৎসাকর্মীদের শরীরে সংক্রমণ পাওয়া গেলে কোভিড হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে অথচ একজন চিকিৎসককে কেন মেডিকেলের আবাসনে রেখে দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশন। সংগঠনের দার্জিলিং জেলা সম্পাদক প্রশান্ত সরকার বলেন, আমরা এদিন হাসপাতাল সুপারের কাছে গিয়ে এই ঘটনার প্রতিবাদ করেছি। মেডিসিন বিভাগের এক চিকিৎসকের করোনা পজিটিভ এলেও তাঁকে আবাসনেই রাখা হয়েছে। অথচ আমাদের কর্মীদের কোভিডে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সুপার ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

- Advertisement -

মেডিকেলের চিকিৎসক, নার্স এবং চিকিৎসাকর্মীরা সংক্রামিত হতে শুরু করেছেন। প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে সেই সংক্রমণ বাড়ছে। একজন সংক্রামিত হলে তাঁর সংস্পর্শে আসা ১০-১৫ জনকে কোয়ারান্টিন সেন্টারে রাখতে হচ্ছে। ফলে চিকিৎসক এবং চিকিৎসাকর্মীর সংখ্যা কমছে। গত ৬ জুন মেডিকেল সুপার ডাঃ কৌশিক সমাজদার এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়ে দেন, এখন থেকে সংকটজনক রোগী ছাড়া অন্য রোগীদের অন্তর্বিভাগে ভর্তি করা য়াবে না। কেন না চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মী কমে যাওয়ায় পরিষেবা দিতে সমস্যা হবে। এই বিজ্ঞপ্তি ঘিরে বিভিন্ন মহলে হইচই হয়। উত্তরবঙ্গে করোনার অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি (ওএসডি) ডাঃ সুশান্ত রায় গত সোমবার মেডিকেলে বৈঠক করে ওই নির্দেশিকা প্রত্যাহার করতে বলেন। সোমবারই নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করে সমস্ত রোগী ভর্তি নেওয়ার নির্দেশ দেন সুপার।

মঙ্গলবার থেকে কাওয়াখালির হাসপাতালে সারির রোগী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানেও করোনা সংক্রামিতদেরই রাখা হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন জেলা এবং মহকুমা হাসপাতাল থেকে রেফার হয়ে প্রচুর রোগী মেডিকেলে আসছেন। বুধবার রাতের হিসাব অনুযায়ী, মেডিকেলের আইসোলেশন-১, ২ সার্জিক্যাল আইডি, গাইনি আইডি মিলিয়ে ৫০ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। আইসোলেশনে আর একটিও শয্যা খালি নেই। আইসোলেশনে থাকা রোগীদের মধ্যে পাঁচজনের লালার নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। বাকিদের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। কিন্তু যে রোগীরা বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি হচ্ছেন তাঁদের লালার নমুনা পরীক্ষা করার কোনও ব্যবস্থা নেই। চিকিৎসকদের একাংশ বলছেন, এখন করোনার সংক্রমণ বেশিরভাগটাই উপসর্গহীন। ফলে বিভিন্ন ওয়ার্ডে কোন রোগী করোনার সংক্রমণ নিয়ে ঘুরছেন কেউ জানেনা। সাধারণ পোশাকেই চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা ওই রোগীদের চিকিৎসা করছেন। ফলে তাঁদের মধ্যেও সংক্রমণ বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। ওএসডি য়েভাবে সমস্ত রোগীকে ভর্তি নেওয়ার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন তার সমালোচনায় মুখর হচ্ছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু চাকরির ভয়ে কেউই মুখ খুলতে চাইছেন না। তবে তাঁরা বলছেন, এক সপ্তাহ পরে চিকিৎসা করার মতো লোক পাওয়া যাবে না। হাসপাতাল সুপার বলেন, আমি একটা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে যা বলেছিলাম সেটার উদ্দেশ্য ছিল কিছুটা রোগী কমানো। কিন্তু রোগী এলে তো আমরা ফিরিয়ে দিতে পারি না। উত্তরবঙ্গ মেডিকেল থেকে কোনও রোগীকে রেফার করা যায় না। কাজেই রোগী এলে ভর্তি নিতেই হত। এখন কার শরীরে সংক্রমণ রয়েছে তা আমরা কেউ জানি না। আর প্রত্যেক ওয়ার্ডের চিকিৎসক, নার্সদের পিপিই দেওয়া, বা যত রোগী ভর্তি হচ্ছেন প্রত্যেকের নমুনা পরীক্ষার মতো ব্যবস্থা নেই।