করোনামুক্ত শরীরে বাসা বাঁধছে জটিল রোগ, চিন্তায় চিকিৎসকরা

1367
ছবি-পিটিআই

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : করোনা সংক্রামিত হয়েছিলেন? কদিন পর রিপোর্ট নেগেটিভ আসায় ভাবছেন আপনি পুরোপুরি বিপন্মুক্ত? না, এমনটা নাও হতে পারে। এই বিষয়ে সতর্ক করছেন চিকিৎসকরা। তাঁদের পর্যবেক্ষণ বলছে, করোনামুক্ত হওয়ার পর বাড়ি ফিরেই আবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকে। শিলিগুড়ি সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে কোভিড পরবর্তী অসুস্থতা নিয়ে মানুষ আসছেন এবং চিকিৎসা করাচ্ছেন। শুধু যে বুক বা ফুসফুসে ফাইব্রোসিস বা পালমোনারি এমবলিজম  (ফাইব্রোসিস) এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের মতো শারীরিক অসুস্থতা হচ্ছে তা নয়, মানসিক অবসাদ, ঘুমের ব্যাঘাত এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ছে বলে চিকিৎসকদের দাবি। করোনামুক্ত হওয়া ৩৫-৪০ শতাংশ মানুষের মধ্যে এই সমস্ত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এমনও দেখা যাচ্ছে, যাঁদের কোনওদিন শ্বাসকষ্ট বা ফুসফুসের সংক্রমণ, হৃৎপিণ্ডের সমস্যা ছিল না, করোনামুক্ত হওয়ার পর তাঁদের শরীরেও এই সমস্যাগুলি দেখা দিচ্ছে।

করোনা সংক্রমণ দিন-দিন বেড়েই চলেছে। শিলিগুড়ি সহ গোটা উত্তরবঙ্গে এখনও পর্যন্ত এক লক্ষের কাছাকাছি মানুষ করোনা সংক্রামিত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে সিংহভাগই সংক্রমণমুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরছেন। কিন্তু করোনামুক্ত বহু মানুষের শরীরেই কোভিড পরবর্তী বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যাঁরা আগে থেকেই ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) অর্থাৎ শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা, ফুসফুসে সংক্রমণ, লিভার, কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন, তাঁদের সেই সমস্যা আরও বেড়েছে। এমনকি আরও নতুন নতুন রোগ শরীরে বাসা বাঁধছে। শুধু যে কোমরবিডিটি অর্থাৎ যাঁরা আগে থেকেই বিভিন্ন অসুখে ভুগছেন তাঁরাই নন, করোনা থেকে সুস্থ হওয়ার পর যাঁদের শরীরে কোনও রোগ ছিল না তাঁরাও শারীরিক অসুস্থতা বোধ করছেন। শিলিগুড়ির বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ জয়দীপ দে বলেন, কোভিড পরিস্থিতির পর থেকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের সমস্যা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। যাঁরা এই সমস্যা নিয়ে আসছেন, তাঁদের মধ্যে এমন বহু রোগী পাওয়া যাচ্ছে যাঁরা এক থেকে তিন মাস আগে করোনা সংক্রামিত হয়েছিলেন। যাঁদের কোমরবিডিটি রয়েছে তাঁদের স্ট্রোক গুরুতর হচ্ছে, অন্যদেরও মাইল্ড স্ট্রোক হচ্ছে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ অনেকের খুব বেশি হচ্ছে এবং রোগীদের বাঁচানো যাচ্ছে না। শিলিগুড়ির বিশিষ্ট চিকিৎসক শেখর চক্রবর্তী (এমডি) বলেন, করোনামুক্ত হয়ে বাড়ি ফেরার তিন সপ্তাহ থেকে তিন মাসের মধ্যে মানুষ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। পালমোনারি ফাইব্রোসিস, শ্বাসকষ্ট, হৃদযন্ত্রে সমস্যা, বুক ধড়ফড় করা ইত্যাদি সমস্যা হচ্ছে। অনেকের পালস রেট অনেকটাই বেশি থাকছে। কিছু কিছু রোগীর স্ট্রোক হচ্ছে, আবার কারও কারও গ্যাসের সমস্যা, ডায়ারিয়া, বমিবমি ভাব থাকছে। বিশেষ করে আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেস্ট মেডিসিন বিভাগের প্রধান প্রফেসার ডাঃ ইন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, করোনামুক্ত হওয়ার পর বুক এবং ফুসফুসের সংক্রমণজনিত সমস্যা নিয়ে প্রচুর রোগী আসছেন। প্রাথমিকভাবে যেটা বোঝা যাচ্ছে যে, করোনা ভাইরাস শরীরে ঢোকার পরে ফুসফুসকে অনেকটাই অকেজো করে দিচ্ছে, যেটাকে আমরা পোস্ট কোভিড ফাইব্রোসিস বলছি। এছাড়াও শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়ছে। যাঁরা আগে থেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত তাঁদের মধ্যেই এটা বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষও যে কোভিডমুক্ত হওয়ার পরে অসুস্থ হচ্ছেন না তা নয়। তবে রোগের তীব্রতা কিছুটা কম থাকছে। অনেকের যক্ষ্মাও (টিবি) হচ্ছে। আমরা কিছু কিছু ওষুধ পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করছি। কিন্তু তার দীর্ঘমেয়াদি সুফল কতটা মিলবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের প্রধান প্রফেসার ডাঃ নির্মল বেরা বলেন, কোভিডমুক্ত হওয়ার পরে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বহু রোগী মেডিকেলে এবং প্রাইভেট চেম্বারগুলিতেও আসছেন। মানসিক অবসাদ, ঘুম না হওয়া, কাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলা, খিটখিটে স্বভাবের রোগী দেখা যাচ্ছে। এসবই করোনা ভাইরাসের প্রভাব। ভাইরাস শরীরে ঢোকার কয়েকদিন পরে বেরিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে নষ্ট করে দিচ্ছে। মেডিকেলের প্যাথলজি বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসার ডাঃ কল্যাণ খান বলেন, সবচেয়ে ভয়ের কথা হল যে, কোভিড পরবর্তী পরিস্থিতিতে যে রোগীরা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন তাঁদের মধ্যে মৃত্যুর হার অনেকটাই বেশি। শুধু যে কোমরবিডিটির রোগীদেরই খারাপ অবস্থা হচ্ছে তা নয়, সুস্থ-সবল মানুষও করোনা সংক্রমণমুক্ত হওয়ার পরেও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারাও যাচ্ছেন। বিশেষ করে হৃৎপিণ্ড, লিভার, কিডনির সমস্যা এবং ফুসফুসে সংক্রমণ থাকছে। তাছাড়া সবচেয়ে ভয়ের কারণ হচ্ছে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ।