সপ্তাহে ৮৪ ঘণ্টা রোগী দেখে অসুস্থ ডাক্তার

180

দেবদুলাল সাহা, হরিশ্চন্দ্রপুর : সরকারি হাসপাতালে কাজের অত্যাধিক চাপ নিয়ে এর আগে অনেকবারই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের তরফে অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু সরকারের কোনো পদক্ষেপ করা হয়নি বলে অভিযোগ। এরই মধ্যে সপ্তাহে ৮৪ ঘণ্টা রোগী দেখতে দেখতে অসুস্থ হয়ে পড়লেন খোদ চিকিৎসক। ঘটনাটি ঘটেছে হরিশ্চন্দ্রপুর-২ ব্লকের ভালুকা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।

শনিবার সকাল থেকে ইনডোর ও আউটডোরে চিকিৎসা পরিসেবা দিতে দিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রবীণ চিকিৎসক ডা. ইসমাইল। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় সেই রাতেই তাঁকে মালদা শহরের একটি নার্সিং হোমে তাঁকে ভরতি করা হয়। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন তিনি। স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এদিকে তাঁর পরিবারের লোকজনের দাবি, অতিরিক্ত রোগীর চাপ নিতে নিতেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ওই চিকিৎসক। খোদ চিকিৎসকের অসুস্থতার খবর চাউর হলে শনিবার রাত থেকেই এলাকায় হইচই শুরু হয়। যদিও প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে, স্বাস্থ্যদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে তারা দ্রুত এবিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।

স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ১০ শয্যাবিশিষ্ট ভালুকা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির অবস্থান চাঁচল মহকুমার মাঝামাঝি জায়গায়। তাই প্রতিদিন হরিশ্চন্দ্রপুর-২, চাঁচল-২ ও রতুয়া-১ ব্লকের কয়েকশো মানুষ এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা পরিসেবা নিতে আসেন। কিছুদিন আগে পর্যন্ত হাসপাতালে মাসিদুর রহমান ও অমিতেন্দু সাহা নামে দুজন চিকিৎসক ছিলেন। কয়েক মাস আগে অমিতেন্দুবাবু কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালে বদলি হয়ে যান। তাঁর জায়গায় স্বাস্থ্যদপ্তরের নির্দেশে স্থানীয় মশালদহ ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ৫৮ বছর বয়সি ডা. ইসমাইলকে এখানে নিয়ে আসা হয়। মাত্র দুবছর পর তাঁর অবসর নেওয়ার কথা। হৃদরোগ সহ বয়সজনিত রোগেও ভুগছেন।

এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগ দেওয়ার পর অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগ চালাতে তাঁর নাভিশ্বাস উঠেছিল। তবে শুধু ইসমাইল নয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অন্য চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরও একই দশা।

জানা গিয়েছে, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দুজন চিকিৎসক, ৪ জন নার্স, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মী ও ৪ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী রয়েছেন। দুজন চিকিৎসক পালা করে সপ্তাহে ৮৪ ঘণ্টা ডিউটি করেন। একজন চিকিৎসককে প্রায় সর্বক্ষণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে হয়। একজন চিকিৎসকের পক্ষে প্রতিদিন আউটডোরে ৪০০-৫০০ রোগী দেখে ফের ইনডোর ডিউটি করাটা অত্যন্ত চাপের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এনিয়ে স্বাস্থ্যদপ্তরে বারবার জানালেও কোনো লাভ হচ্ছে না বলে স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি গ্রামবাসীরাও জানাচ্ছেন। আরও অভিযোগ, স্বাস্থ্যদপ্তরের এই উদাসীনতায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। এই ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীদের অসম্ভব চাপ। সবসময় কমপক্ষে দুজন স্থায়ী চিকিৎসক দরকার।

এলাকার বাসিন্দা তথা ভালুকা গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য সুদীপ্ত চৌধুরিও এনিয়ে অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, সবসময়ের জন্য এখানে দুজন তরুণ চিকিৎসকের প্রযোজন রয়েছে। কারণ, রাতবিরেতে হরিশ্চন্দ্রপুর, রতুয়া ও চাঁচল এলাকার বিভিন্ন গ্রাম থেকে অনেক রোগী এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসে। এমনকি প্রতিবেশী রাজ্য, বিহারের কাটিহার জেলা থেকেও অনেক রোগী ফুলহর পেরিয়ে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই আসেন। এখানে শুধু চিকিৎসক নয়, শয্যা সংখ্যাও বাড়ানো প্রয়োজন। এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ৫৮ বছর বয়সি চিকিৎসক ইসমাইল এখন নিজেই হৃদরোগে ভুগছেন। এই বয়সে তিনি এত রোগীর চাপ সামলাতে অক্ষম। শনিবার রাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে নার্সিং হোমে ভরতি করা হয়েছে। তাই আমরা ভালুকা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সবসময়ের জন্য দুজন চিকিৎসক চাই। একইসঙ্গে আমরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিকাঠামোরও দ্রুত উন্নতি চাই। তা না হলে এলাকাবাসী বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।

ভালুকা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বর্তমান স্বাস্থ্য আধিকারিক মাসিদুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, এখানে রোগীর চাপ প্রচুর। এর আগে আমরা দুজন চিকিৎসক ছিলাম। কোনোরকমে ইনডোর ও আউটডোর সামাল দিচ্ছিলাম। প্রবীণ চিকিৎসক ইসমাইল সাহেবের পক্ষে ওই চাপ নেওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া তিনি নিজেই অসুস্থ। শনিবার রোগী দেখতে দেখতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে রবিবার আমি বাড়ি থেকে চলে আসি। আমাকেও সপ্তাহে অন্তত ৮৪ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়। একার পক্ষে এটা বেশ যন্ত্রণাদায়ক। তবু রোগীদের কথা ভেবে চিকিৎসা পরিসেবা দিয়ে যাচ্ছি। সমস্যার কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এনিয়ে এলাকাবাসীর ক্ষোভও রয়েছে। যা পরিস্থিতি, তাতে এখন আমাকেই সবকিছু সামলাতে হচ্ছে।

এনিয়ে ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক সাবির আলি ও চাঁচল মহকুমার সহকারী মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সোমনাথ ভট্টাচার্যেরর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁদের তরফে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এদিকে জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সৈয়দ শাজাহান বিশ্বাসকে ফোন করে এবং মেসেজ পাঠিয়েও কোনো উত্তর মেলেনি।

তবে চাঁচলের মহকুমাশাসক সব্যসাচী রায় এপ্রসঙ্গে বলেন, ভালুকা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সমস্যার বিষয়টি নিযে স্বাস্থ্যদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। দ্রুত সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।