নদী কাড়ল প্রভুর প্রাণ, চোখে জল নিয়ে ঘাটে বিশু

1216

শুভদীপ শর্মা, ময়নাগুড়ি : যাঁরা এইচএমভির গ্রামোফোন রেকর্ড দেখেছেন, ছবিটা তাঁদের খুব চেনা। গ্রামোফোনের চোঙের সামনে একটি কুকুর স্থির হয়ে বসে। খুব মন দিয়ে কী যেন শুনছে। গল্পটা অনেকেরই জানা। লিভারপুলে ফ্রান্সিস ব্যারর্ড নামে এক শিল্পী থাকতেন। মার্ক নামে তাঁর এক ভাই ছিলেন। হঠাৎ একদিন মার্ক মারা যাওয়ার পর তাঁর একটি গ্রামোফোন প্লেয়ার, ভাইয়ের স্বর রেকর্ড করা বেশ কিছু গ্রামোফোন ও তাঁর কুকুর নিপার ফ্রান্সিসের হাতে আসে। সময় কাটাতে ফ্রান্সিস একদিন ওই গ্রামোফোন প্লেয়ারে ভাইয়ের রেকর্ড চালিয়েছিলেন। হঠাৎই লক্ষ্য করেন, নিপার তড়িঘড়ি ছুটে এসে গ্রামোফোনের সামনে বসে ভাইয়ের গলার স্বর শুনছে। প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ হয়ে ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গেই সেই দৃশ্য রংতুলিতে তুলে ধরেন। তারপরের ঘটনা ইতিহাস। কুকুরের প্রভুভক্তির ইতিহাসে এই ঘটনা এক মাইলস্টোন। ময়নাগুড়িও একই বিষয়ে সাক্ষী রইল। মঙ্গলবার সকাল ৬টা নাগাদ মহাকালপাড়ায় জরদা নদীর ঘাটে স্নান সারতে এসে কানু মালাকার (৪৬) নামে এক ব্যক্তি নদীতে তলিয়ে যান। মার্কের নিপারের মতো নিজের কুকুরবন্ধু বিশুকে নিয়ে এদিন ময়নাগুড়ির সিনেমাহলপাড়ার বাসিন্দা পেশায় লটারি বিক্রেতা কানুবাবু ঘাটে এসেছিলেন। তিনি নদীতে তলিয়ে যাওয়ার পর থেকে বিশু একদম মনমরা হয়ে পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে সে ঘাটেই পড়ে ছিল। বাসিন্দারা বহু চেষ্টা করেও তাকে এলাকা থেকে সরাতে পারেননি। বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে পাঁচ ঘণ্টা পর মৃতদেহ উদ্ধার করেন। মৃতদেহ এলাকা থেকে নিয়ে যাওয়ার পরই বিশু এলাকা ছাড়ে। দেশি প্রজাতির সারমেয়টির এই কীর্তি দেখে অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।

এদিকে, গত তিন বছরে এই ঘাটে এভাবে ছজনের মৃত্যুর ঘটনায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ঘাটের কাছে নদীটি বিপজ্জনকভাবে গভীর হয়ে পড়েছে বলে বাসিন্দাদের অভিযোগ। ময়নাগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান সজল বিশ্বাস বলেন, বিপজ্জকনক ঘাট হিসাবে এটিকে চিহ্নিত করে এর আগে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছিল। সমস্যা মেটাতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে কাজ করা হবে বলে বিডিও শুভ্র নন্দী ও ময়নাগুড়ি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি শিবম রায়বসুনিয়া জানান। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, কানুবাবু তাঁর আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতেন। প্রতিদিন সকালেই জরদায় স্নান সারতেন। তাঁর আত্মীয় দুলাল সরকার বলেন, অন্যদিনের তুলনায় অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও দুর্গাবাড়িতে কানু এদিন দোকান না খোলায় আমরা চিন্তায় পড়ি। আশপাশে না পেয়ে জরদা নদীর ঘাটে গিয়ে তার জামাকাপড় ও তার জুতোর খোঁজ মেলে। সেই সময় নদীর ঘাটে বিশুকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। চোখে জল। কানুবাবু যে নদীতে নেমে তলিয়ে গিয়েছেন তা বুঝতে কারও সমস্যা হয়নি। খবর চাউর হতেই এলাকায় বাসিন্দাদের ভিড় জমে। পুলিশ ও প্রশাসনের আধিকারিকদের পাশাপাশি কানুবাবুর সতীর্থ ব্যবসায়ীরাও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সবাই মিলে বহু চেষ্টা করেও বিশুকে ঘটনাস্থল থেকে একচুল সরাতে পারেনি। ব্যবসায়ী শৈলেন রায়, শান্তি সাহা, শচীন রায় প্রমুখ জানান, কানুবাবু বিশুকে তিনবেলা খাওয়াতেন। কুকুরটি রোজই তাঁর সঙ্গে জরদা নদীর ঘাটে আসত। এই সূত্রে দুজনের মধ্যে নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। প্রভুকে জলে ডুবে যেতে দেখে সে তাঁকে বাঁচাতে বহু চেষ্টা করেও বিফল হয়। এরপর শোকে সে পাড়েই শুয়ে ছিল। পরে মৃতদেহ উদ্ধারের পর হাসপাতালে পাঠানো হলে বিশু এলাকা ছাড়ে। ময়নাগুড়ি পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য মনোজ রায় বলেন, কুকুরের প্রভুভক্তির বিষয়ে বইয়ে পড়েছিলাম। এদিন তা চাক্ষুষ করলাম। পরিবেশপ্রেমী নন্দু রায়ের কথায়, মানুষ প্রতিদান দিতে জানে না, ওরা জানে।

- Advertisement -