ধূপগুড়ি থানার পুলিশের আতিথেয়তায় বাড়ছে সারমেয়কুল

সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি : নিরাপত্তার দিক থেকে দেখলে এমনিতেই থানা মানে পুলিশবাবুদের পাহারায় নিরাপদে থাকা। তবে শুধু নিরাপত্তাই তো শেষ কথা নয়। পেটের খিদেটাও একটা বড়ও ফ্যাক্টর বেঁচে থাকার জন্য। সেদিক দিয়ে থানা কতটা ভরসাস্থল তা নিয়ে প্রশ্ন আছেই। থানার আবাসিক মূলত দুরকম। যেসব পুলিশকর্মী পরিবার নিয়ে কোয়ার্টারে থাকেন তাঁরা বাড়িতেই রান্না করে খান। আর যাঁরা একা থাকেন কোয়ার্টার বা মেসে, তাঁরা কোঅপারেটিভ করে মেসেই খাওয়াদাওয়া করেন। বাজার করা থেকে মাসের গালামাল, শাকসবজি কেনা সবই চলে ভাগাভাগি করে। এর বাইরে যাঁরা লকআপে আসে-যায়, তাদের জন্য কাছাকাছি কোনও হোটেল থেকে দুবেলা খাবার আসে। মোটের ওপর এ তল্লাটের প্রায় সব থানার চিত্রটা একই। এর বাইরে অতিথি বলতে যাঁরা থানায় যান তাঁদের জন্য ওই যৎসামান্য চা-বিস্কুটের আযোজন হয়।

তবে পুলিশ ও কয়েদি ছাড়া থানায় অতিথি হিসেবে দীর্ঘদিন থাকার অভিজ্ঞতা সেভাবে মনে করে কেউ বলতে পারবেন কি না কে জানে। ধূপগুড়ি থানায় মার্চের লকডাউনের শুরুতে এভাবেই কয়েকজন অতিথি এসেছিল। গত কয়েক মাসে সেই অতিথির সংখ্যা উত্তরোত্তর বেড়ে এখন প্রায় পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। পুলিশবাবুদের আপ্যায়ন আর আতিথেয়তায় সপরিবার তারা বহাল তবিয়তেই সংসার গুছিয়ে বসেছে থানা চত্বরেই। চা-বিস্কুট নয়, বরং এই অতিথিদের জন্য নিয়ম করে দুবেলা রান্না হচ্ছে মেসে। সেই সঙ্গে টিফিন মিলছে নিয়মিত। আর সব মিলে নিরাপদ পুলিশি আশ্রয়ে সুখেই ঘরকন্যা করছে প্রায় পঞ্চাশটি চার পেয়ে অতিথি। নিয়মিত খাওয়া আর আশ্রয় পেয়ে রোগা, হাড় জিরজিরে অবস্থা থেকে অনেকেই এখন বেশ নাদুসনুদুস বপু ধারণ করেছে। শুধু খাওয়াই নয়, নিয়ম করে কড়া পুলিশি পাহারায় গিলতে হচ্ছে ওষুধ ও পথ্যিও।

- Advertisement -

পরম যত্নে সাবেক পথকুকুর তকমা ঝেড়ে আপাতত পুলিশের অতিথি পরিচয়ে থানা চত্বর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা। নিয়মিত যাঁরা থানায় যান তাঁদের অভিজ্ঞতা, এঁরা নাকি এই কমাসে এতটাই সভ্য এবং ডিসিপ্লিনড হয়ে গিয়েছে যে কামড়ানো তো দূরের কথা, সামান্য ঘেউটাও করেন না এখন। গোটা থানা চত্বরেই আপাতত তাদের নিরাপদ ঘোরাফেরা। লকডাউনের শুরুতে জেলা পুলিশের তরফে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল ভবঘুরেদের পাশাপাশি যতটা সম্ভব পথকুকুরদের যেন খাবার দেওয়া হয়। সেই সূত্রেই শহরজুড়ে রান্না করা খাবার বিলি শুরু করেন পুলিশকর্মীরা। লকডাউন শিথিল হতে শুরু করলে জেলাজুড়ে সেই কর্মসূচি থেমে গেলেও ধূপগুড়ি থানার আইসি সুবীর কর্মকারের ইচ্ছেতেই এখানে চালু থাকে সেই কাজ। তবে আগের মতো ঘুরে ঘুরে খাবার বিলির বদলে থানা চত্বরেই পাতপেড়ে খাওয়ানো শুরু হয়। এর আগেও থানার আইসি আহত সন্তানহারা পথকুকুরকে উদ্ধার করে থানায় আশ্রয় দিয়ে সংবাদ শিরোনামে এসেছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টাতেই এ যাত্রায় প্রায় পঞ্চাশটি পথকুকুর বর্তমানে থানায় বহাল তবিয়তে দিন কাটাচ্ছে।

প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালেই চলছে পুলিশের এই প্রাণীসেবা। আইসি সুবীর কর্মকার অবশ্য এনিয়ে কিছু বলতে নারাজ। তিনি বলেন, এই করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের খাবার জোগাড় করাই একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে পথকুকুরদের খাবার জোগাড় করাটা আরও চাপের। আমরা আমাদের সাধ্যমতো কাজটা চালিয়ে যাচ্ছি মাত্র। পুলিশকর্মীদের এই উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে আশপাশের বাসিন্দাদের। এলাকার বাসিন্দা তথা পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার সুজাতা সরকার বলেন, শুরুতে হাতে গোনা কয়েকটা কুকুর ছিল। এখন তো অনেক হয়ে গিয়েছে। আমরা আশ্চর্য হয়ে যাই নিয়মিত ডিউটির ফাঁকে পুলিশকর্মীরা এদের খাবার দিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশ নিয়ে হাজারো অভিযোগ আর খারাপ কথার মাঝে এই চিত্রটা নিশ্চই একটা উজ্জ্বল মানবিক দিক তুলে ধরেছে পুলিশকর্মীদের।