ভয় পান না কিছুতেই, লক্ষ্যে স্থির লক্ষ্মী

93

অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়, মালদা : মৃত্যুর বেড়াজালে বসেও দেখবেন মানুষ বাঁচার কিছু না কিছু খড়কুটো তুলে ধরে। সহজে হাল সে ছাড়ে না। সেদিন আপনাদের বলছিলাম, মহম্মদ রুনু শেখের কথা। কাজ হারানো রাজমিস্ত্রি সেই গানওয়ালার গল্প। আজ সকালে যখন পেঁয়াজি মোড়ে চা খেতে গিয়ে ওঁর সঙ্গে হঠাৎ দেখা, ওঁকে দেখালাম কাগজটা। কী যে খুশি। সবাইকে ডেকে ডেকে বলছেন, দ্যাখ, আমি কাজ হারিয়ে শুধু গান গেয়ে বিখ্যাত হয়ে গেলাম। তারপরেই বললেন, চলেন দাদা, চা খাবেন। আমি তার একটু আগেই দু কাপ চা খেয়েছি। আর খেলাম না। বললেন, চলি দাদা, একদিন বাড়ি যাব আপনার। আজকে একটা কাজ পেয়েছি। দেখি, যদি দুটো পয়সা আসে।

এই হচ্ছে সাধারণ মানুষ। নেতা-মন্ত্রীরা এঁদের মনের, এঁদের জীবনের কতটা খোঁজ রাখেন জানি না। কিন্তু এঁরা এভাবেই সহজ স্বাভাবিকভাবেই বাঁচেন। দুবেলা পেটের দায়ই হল এঁদের কাছে সবচেয়ে বড় লড়াই। সে লড়াই এঁরা শত ভাইরাসের ভয়ে ছাড়তে পারেন না।

- Advertisement -

আজ আপনাদের বলছি অন্য আরেকজনের কথা। হায়দারপুরের ভেতরের গলি দিয়ে যে রাস্তাটা জাতীয় সড়কে উঠছে, সেখান থেকে বাঁদিকে, মানে রথবাড়ির দিকে যেতে বাঁ হাতে ছোট্ট একটা ভ্যান দেখতে পাবেন। ঘরের লক্ষ্মী তো আপনারা অনেকেই দেখেছেন। এ-ও এক লক্ষ্মী। তবে লক্ষ্মী বলতে আমরা যা বুঝি ইনি সেরকম নন। লকডাউন আসুক, করোনা আসুক, অভাব আসুক, একা লড়তে জানেন। লড়েনও একা। সঙ্গে দুই নাবালক। স্বামী মারা গিয়েছেন বছর তিনেক আগে দুর্ঘটনায়।

আশেপাশে সারিসারি অনেক ডালপুরির দোকান। সকাল থেকে চালু হয়ে যায়। লক্ষ্মী প্রামাণিকই একমাত্র মহিলা যিনি এই এলাকায় ডালপুরি বিক্রি করেন। বাকিরা সবাই পুরুষ। এত পুরুষের মধ্যে একা কাজ করতে ভয় করে না? বললেন, যা হবে দেখা যাবে। আগে তো বাঁচি।

সেই ভোর ৫টায় ঘুম থেকে ওঠেন। তরকারি সেদ্ধ করেন। মঙ্গলবাড়ি থেকে সাইকেল নিয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে ৭টার মধ্যে চলে আসেন রথবাড়ির দোকানে। অন্য সময় ১২টা অবধি দোকান খোলা রাখতেন। এখন লকডাউনের জন্য ১০টায় বন্ধ করে দেন।

বড় ছেলে দীপ ক্লাস সেভেনে পড়ে। এখন স্কুল বন্ধ। মাকে আটা মেখে সাহায্য করে দিচ্ছে। ছোটজন টুতে পড়ে। প্রথম প্রথম দোকান বসানোর সময় এলাকার নেতারা বাধাও দিয়েছিল। তবু দমে যাননি লক্ষ্মীদেবী। ছেলে দুটোকে যে মানুষ করতে হবে। নিজে পড়াশোনা করেছেন ক্লাস ফোর পর্যন্ত। কিন্তু স্বপ্ন হারায়নি চোখ থেকে। করোনা যেমন আছে, এরকম মানুষের বাঁচার লড়াইও কিছু আমাদের চারপাশেই আছে।

জিগ্যেস করলাম, রোজ খোলা রাখেন দোকান? ক্লান্ত লাগে না? বললেন, ৩০ বছর বয়স হল। ক্লান্ত কি লাগে না? কিন্তু খাওয়াবে কে? দুদিন লোকে দেখবে। তারপর? ভয় পেলে চলবে? বললাম, এবার একটা সাইনে বার্ড লাগান দোকানের সামনে। ক্লান্তির হাসি হাসলেন লক্ষ্মী প্রামাণিক।