জোর করে ভ্যাকসিন দেবে না, তাই আতঙ্কিত হবেন না

331

ডাঃ শমীক বসু : কোভিড ভ্যাকসিন নিয়ে সারা দুনিয়ায় এখন তোলপাড় চলেছে। আমাদের দেশে কবে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে, কারা ভ্যাকসিন কোন ধাপে পাবেন, এই ভ্যাকসিন কতটা সুরক্ষিত- এসব নিয়ে আমজনতার কৌতূহলের শেষ নেই। এই ভ্যাকসিন ট্রায়াল পিরিয়ডের সব ধাপ যথাযথভাবে পেরিয়েছে কি না, তা জানতে উদ্গ্রীব সকলেই। ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখা যাক।

যে সব ভ্যাকসিন ফেজ-২ ট্রায়াল পেরিয়ে ফেজ-৩ ট্রায়ালে আছে সেগুলি দুটো জিনিস প্রমাণ করতে পেরেছে। এক, এগুলো নিরাপদ। মানে, যাঁদের এই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে তাঁদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুব কম (মৃত্যু বা মারাত্মক ক্ষতি)। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, সব ভ্যাকসিনেরই কিছু না কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। দুই, এগুলো ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এবার আসি ফেজ-৩ ট্রায়ালে। এটা ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার পরীক্ষা। এই পর্যায়ে পরীক্ষার জন্য সাধারণত ২০ থেকে ৩০ হাজার একই ধরনের লোককে বেছে নেওয়া হয়, মানে যাঁদের বয়স, শারীরিক সুস্থতা একইরকম। এবার এই স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে থেকে র্যান্ডম বেছে নিয়ে সমান দুভাগ করে এক দলকে ভ্যাকসিন ও আরেক দলকে প্লাসিবো দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে কারা ভ্যাকসিন পেলেন আর কারা প্লাসিবো পেলেন, তা দাতা ও গ্রহীতাদের কেউ জানেন না। এই পদ্ধতিকে মেডিকেলের ভাষায় বলা হয়, ডাবল ব্লাইন্ডেড র্যান্ডমাইজড ট্রায়াল। এবার কয়েমাস ধরে নিরীক্ষা করা হয়- ওই ভ্যাকসিন ও প্লাসিবো গ্রহীতাদের মধ্যে কারা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তারপর আলাদা কয়েকটা গ্রুপ করে বিশ্লেষণ করা হয় কারা কতটা অসুস্থ হয়েছেন। এই স্ট্যাটিস্টিকাল তথ্য বিশ্লেষণ করে বোঝা যায় ভ্যাকসিন কতটা কার্যকর। এই ট্রায়াল ১৮ মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত চলতে পারে। যত বেশি লোককে যত বেশিদিন ধরে নিরীক্ষা করা যায়, ততই ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। মনে রাখতে হবে, মহামারি পরিস্থিতিতে এত সময় পাওয়া যায় না। প্রাণ বাঁচানোর জন্য অনেক কিছুতেই তাড়াহুড়ো করতে হয়। তার মানে এই নয় যে, ভ্যাকসিনের ট্রায়াল শর্টকাটে সেরে ফেলা হয়েছে। ধাপগুলো একই থাকে, তবে সময় কম থাকায় কম সংখ্যায় ভলান্টিয়ার নেওয়া হয়। তাই স্ট্যাটিস্টিকাল ডেটা (তথ্য) কম পাওয়া যায়।

- Advertisement -

এখনও পর্যন্ত যে তিনটে ভ্যাকসিন নিয়ে বেশি আলোচনা চলছে তার কোনওটাই কিন্তু ১০০ শতাংশ কার্যকর নয়। আসলে কোনও ভ্যাকসিনই ১০০ শতাংশ কার্যকর হয় না। তাছাড়া করোনার ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, এটা নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা নয়। স্বেচ্ছাসেবকদের টিকা দেওয়ার পর তাঁদের একইভাবে করোনা ভাইরাসের সংস্পর্শে আনা হয়নি বা করোনা ভাইরাসের একই ডোজ তাঁদের শরীরে প্রযোগ হয়নি। আসলে ভাইরাস ডোজ মেপে দেওয়া যায় না। আবার সবাইকে একইরকম পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় না। মানে কে কতক্ষণ মাস্ক কীভাবে ব্যবহার করছেন, করোনা ভাইরাসে কতটা এক্সপোজড হচ্ছেন- তা দেখা হয়নি। তাই যে সমীক্ষা হল, তা তাত্ক্ষণিক। কিন্তু এখন করোনা পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিন দেওয়া দরকার। আসলে করোনার মতো নতুন ভাইরাস মিউটেট করার আগেই ভ্যাকসিন দেওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, ভ্যাকসিন নিয়ে কেউ মারা যাননি বা কারও বড় কোনও শারীরিক সমস্যা হয়নি। এটাই আশার কথা।

এবার আরেকটা প্রসঙ্গ- মিডিয়ায় অনেক কিছু বলা হচ্ছে। তথ্য মানুষকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু অসম্পূর্ণ তথ্য মগজের ভার বাড়ায়। আপনি না চাইলে কেউ আপনাকে ভ্যাকসিন দেবে না। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। ভয় লাগলে অপেক্ষা করবেন। কারণ ২০২২ সালের আগে সাধারণ মানুষ ভ্যাকসিন পাবেন বলে মনে হয় না। ইতিমধ্যে অনেক তথ্য সামনে আসবে। ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কার মানে কোভিড যোদ্ধারা আগে ভ্যাকসিন নেবেন। তাঁদের ওপর প্রভাব বোঝা যাবে। কয়েক কোটি স্বাস্থ্যকর্মীর উপর ভ্যাকসিন প্রয়োগের ফল জানা যাবে। সেই সমীক্ষার ফলকে বলা হয়, রোবাস্ট এফিসিয়েন্সি ডেটা অর্থাৎ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত তথ্য। তা বিশ্লেষণ করে আরও তথ্য পাওয়া যাবে। একটা কথা মনে হচ্ছে- ১১ বছর ধরে ভ্যাকসিন দিচ্ছি। কোনও বাবা-মা তো সন্তানকে ভ্যাকসিন দেওয়ার আগে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানতে চাননি। প্যারাসিটামল, অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার আগে তো কেউ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানতে চান না। তাহলে আজ করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে কী হল? তাই বলছি, ভয় পাবেন না। ভ্যাকসিন নিয়ে সন্দেহ থাকলে তা নেওয়ার আগে অপেক্ষা করুন। কিন্তু মাস্ক পরবেন, হাত ধোবেন বারবার।