শীত পড়ছে, আতঙ্ক নয়, সতর্ক থাকুন

কয়েকদিন ধরেই বেশ ঠান্ডা পড়ছেহঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তনে অনেকেই বিভিন্ন অসুখবিসুখে ভোগেনঠান্ডাজনিত বিভিন্ন সমস্যা হলে সহজে সারতে চায় নাশীতকালে কারও শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়বয়স্করা কম হাঁটাচলা করায় তাঁদের বাতের সমস্যা বাড়েঅনেকের চর্মরোগ হয়শীতকালীন বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে জানিয়েছেন দিনহাটা মহকুমা হাসপাতালের চিকিৎসক উজ্জ্বল আচার্য

শীতকালে বাতাস ভারী হওয়ায় অসংখ্য রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু যেমন ভাইরাস, ব্যাকটিরিয়া শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে শ্বাসযন্ত্রের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং খুব সহজেই মিউকাস মেমব্রেনকে আক্রমণ করে। আমরা জানি, বয়স্ক ও বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। তাই রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুগুলো খুব সহজেই তাদের কাবু করে ফেলে। শীতের শুরুতে এই সব জীবাণুর উপদ্রব বেড়ে যায়। ফলস্বরূপ শ্বাসযন্ত্রের নানা রোগ যেমন, সর্দিকাশি, জ্বর বা ইনফ্লুয়েঞ্জা, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, গলাব্যথা, টনসিলাইটিস, ল্যারিংজাইটিস, ফ্যারিনজাইটিস, মামস, হাম, চিকেন পক্স ইত্যাদি দেখা যায়। আবার এ সময় বাতাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতার পরিমাণ খুব কম থাকে। তাই ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা যেমন, হাত-পা ফাটা, ঠোঁট ফাটা, চুলকানি, খুশকির প্রাদুর্ভাবও দেখা যায়। এছাড়া এই শীতেই বাতের ব্যথা, প্রেশার, স্ট্রোক, হাঁপানির প্রকোপ বাড়ে।

- Advertisement -

শীতের প্রধান রোগ :

ইনফ্লুয়েঞ্জা / সর্দিকাশি-জ্বর

বেশ কিছুদিন ধরে সামান্য সর্দিকাশি, সঙ্গে হালকা জ্বর ইনফ্লুয়েঞ্জার উপসর্গ। এটি ভাইরাসঘটিত রোগ। সর্দিকাশির মাধ্যমে একজনের থেকে অন্যজনের শরীরে খুব সহজেই সংক্রামিত হয়। শীতের শুরুতে বা শীতে ঠান্ডা লেগে যে কেউ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এছাড়া জ্বর, সর্দিকাশির সঙ্গে গলাব্যথা, গা-হাত-পা ব্যথা, মাথাব্যথা, খাওয়ায় অনীহা, চোখ দিয়ে জল পড়া থাকতে পারে। সময়ে চিকিৎসা না করে একে অবহেলা করলে এর থেকে মারাত্মক নিউমোনিয়া হতে পারে।

নিউমোনিয়া

হঠাৎ প্রচণ্ড জ্বর, কাঁপুনি, শীত শীত ভাব, শ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া, সঙ্গে বুকে ব্যথা নিউমোনিয়ার লক্ষণ। শীতকালে এ রোগের প্রাদুর্ভাব খুব বেশি ঘটে। সময়ে চিকিৎসা না করলে শ্বাসকষ্ট মারাত্মক আকার নিতে পারে। কাজেই এ সময়ে এই রোগে আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রযোজন।

টনসিলাইটিস

শীতকালে বা শীতের শুরুতে কমবেশি সব শিশু-কিশোরর টনসিলের ব্যথায় ভোগে। গলাব্যথা, খাওয়ায় অনীহা, ঢোঁক গিলতে অসুবিধা, জ্বর, গা-হাত-পা ব্যথা, কান ব্যথা টনসিলাইটিসের উপসর্গ। এ সময় ঠান্ডা কোনও জিনিস একেবারে খাওয়া চলবে না। গলায় মাফলার জড়িয়ে রাখতে হবে। গরম গলা খাবার খাওয়া দরকার। নিয়মিত গার্গল করা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবাযোটিক খেতে হবে, না হলে কিন্তু টনসিলে পুঁজ জমে ফোড়া হতে পারে।

শ্বাসকষ্ট

শীতকালের আরেক বিরক্তিকর উপসর্গ হল শ্বাসকষ্ট। বাযুদূষণ, বাতাসে জীবাণু বা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এবং বাতাসে হিস্টামিন সৃষ্টিকারী পদার্থের প্রাদুর্ভাবে শ্বাসকষ্ট দেখা যায়। এছাড়া যাঁদের হাঁপানির ইতিহাস আছে এই সময় কিন্তু এর প্রকোপ বাড়ে। শীতের শুরুতে বা শীতকালে ব্রংকাইটিস অর্থাৎ শ্বাসনালির প্রদাহ দেখা দেয়। এর উপসর্গ হল, কফ এবং কাশি।

চিকেন পক্স

এটি মারাত্মক ভাইরাসঘটিত ছোঁয়াচে রোগ। শীতকালে বেশি দেখা যায়। পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে অন্যরাও কিন্তু বাদ যান না। সারা দেহে গুটি বা র্যাশ, সঙ্গে জ্বর এবং গা-হাত-পা ব্যথা এই রোগের প্রধান উপসর্গ। এসময় আলাদা ঘরে থাকার পাশাপাশি শুরুতেই ডাক্তারের পরামর্শমতো অ্যান্টিভাইরাল খেলে রোগের ভয়াবহতা কমে যায়।

বাতের ব্যথা

শীতকালে অনেকেরই শরীরের পেশির ব্যবহার ঠিকমতো হয় না। অনেকে হাঁটাচলাও কম করেন। এছাড়া শীতকালে শরীরের জয়েন্টগুলির ফ্লুইডের মাত্রা কমে যায়। ফলে বাতের ব্যথা বাড়ে। এ সময় ঘরে বসে না থেকে শরীরকে সচল রাখতে হবে। হাঁটাচলা করতে হবে। ব্যায়াম করলে উপকার মেলে। এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শমতো ফিজিওথেরাপি করাতে পারেন।

প্রেশার / স্ট্রোক

এই সময়ে রক্তবাহী শিরা-ধমনী সংকুচিত হয়। ফলে প্রেশার যেমন বাড়ে, তেমনই হৃৎপিণ্ড বা মাথায় অক্সিজেনের অভাব ঘটে। এতে স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাড়ে। অতএব শীতকালে নিয়মিত প্রেশার মাপানো এবং প্রেশারের ওষুধ খাওয়া দরকার।

চর্মরোগ

শীতের শুরুতেই বা শীতকালে হাত-পা, ঠোঁট ফাটা, চামড়া খসখসে হয়ে যাওয়া, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, চুলকানি বা মাথায় খুশকি হতে দেখা যায়। নিয়মিত ভেসলিন, গ্লিসারিন বা নারকেল তেল ব্যবহার করলে হাত-পা, ঠোঁট ফাটা বন্ধ করা যায়। গোড়ালি ফাটা বন্ধ করার জন্য প্রতি রাতে ঈষদুষ্ণ জলে একটু শ্যাম্পু মিশিয়ে গোড়ালি পাঁচ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে। তারপর শুকনো তোয়ালে দিয়ে ভালো করে মুছে নিয়ে ভেসলিন, গ্লিসারিন বা নারকেল তেল মেখে নিলে উপকার মেলে।

শীতের শুরুতে বা শীতকালে বেশি ঠান্ডা লাগানো চলবে না। প্রাতর্ভ্রমণ না করাই ভালো। প্রয়োজনে বিকেলে বা সন্ধ্যায় হাঁটতে পারেন। তবে ঘরে চুপচাপ বসে না থেকে শরীরকে সচল রাখতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শমতো ওষুধ এবং ইনহেলার অবশ্যই নিতে হবে।