রাঙ্গালিবাজনা : তিনি  ছিলেন গান্ধীবাদী নেতা। অসহযোগ আন্দোলনে ছাত্রাবস্থাতেই জড়িয়ে পড়েন তিনি। তবে, দেশ স্বাধীন করতে বিপ্লবী আন্দোলনেও জড়ান  তিনি । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আততায়ীর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে  প্রাণ হারাতে হতে  হয় তাঁকে।  তিনি যজ্ঞেশ্বর রায়। একসময়ে ‘ডুয়ার্সের গান্ধী’ নামেই পরিচিত ছিলেন তিনি। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান তথা ইতিহাস গবেষক ড: আনন্দগোপাল ঘোষ বলেন, ‘ডুয়ার্স তথা উত্তরবঙ্গের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ করে স্বাধীনোত্তর কালে শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে যজ্ঞেশ্বর রায়ের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তবে, সরকারিভাবে  যজ্ঞেশ্বর রায় প্রাপ্য মর্যাদা আজও পাননি।’

সেটা ব্রিটিশ জমানা। অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলার বার্ণিশ এলাকার মরিচবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তিস্তার বন্যায় তখন প্রতি বছর প্লাবিত হত ওই এলাকা। সেসময় যজ্ঞেশ্বর রায়ের পরিবার চলে আসে রাঙ্গালিবাজনা গ্রামে। আলিপুরদুয়ারের ম্যাকউইলিয়াম হাইস্কুলে ভর্তি হন তিনি। তবে, ছাত্রাবস্থাতেই জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। যোগ দেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। তখন তিনি দশম শ্রেণির ছাত্র।

রাঙ্গালিবাজনা মোহনসিং হাইস্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক হরিমোহন বর্মনের লেখা থেকে জানা যায়, ১৯২০ সাল নাগাদ স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেন যজ্ঞেশ্বর রায়। পরিচয় হয় মোহিনীমোহন পাকড়াশির সঙ্গে। মোহিনীমোহন পাকড়াশির নের্তৃত্বে বেশ কয়েকজন স্বাধীনতা সংগ্রামী কুমারগ্রাম থানা আক্রমণ করে ব্রিটিশ পুলিশকে তাড়িয়ে দিয়ে থানাটি নিজেদের দখলে রাখেন বেশ কয়েকদিন  তবে, মূলত গান্ধীবাদি নেতা ছিলেন তিনি।  ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে প্রসারিত করতে গিয়ে একসময় ডুয়ার্সের অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠে ‘ডুয়ার্সের গান্ধী’ হিসেবে।

১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়ি জেলা ও শিলিগুড়ি মহকুমার বিরাট এলাকার বিধায়ক হন তিনি । ১৯৬২ সাল পর্যন্ত টানা বিধায়ক ছিলেন যজ্ঞেশ্বরবাবু।  দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি মন দেন দেশ গঠনে । উঠতি প্রজন্মের জন্য  চাই শিক্ষা । ১৯৪৮ সালে এলাকার একদল সমাজসেবীকে পাশে নিয়ে রাঙ্গালিবাজনায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন রাঙ্গালিবাজনা মোহনসিং হাইস্কুল। জটেশ্বর, ময়নাগুড়ি, চালসা, কালিয়াগঞ্জ,  কামাখ্যাগুড়ি সহ অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর  স্কুল প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা নেন তিনি । তখন রাঙ্গালিবাজনা পর্যন্ত জাতীয় সড়ক ছিল না । রাঙ্গালিবাজনা মোহনসিং হাইস্কুল পরিদর্শনের  জন্য তৎকালীন রাজ্যপাল হরেন্দ্রকুমার মুখার্জিকে নিকটবর্তী রেলস্টেশনে নামিয়ে রেললাইন দিয়ে ট্রলিতে চাপিয়ে নিয়ে আসেন জঙ্গলাকীর্ণ রাঙ্গালিবাজনায়। দুস্থ পড়ুয়াদের জন্য মোহনসিং হাইস্কুলের চত্বরেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ছাত্রাবাস। বিদ্যালয়ের  অদূরে প্রতিষ্ঠা করেন একটি হাট। ওই হাট এখনও পরিচিত এমএলএর হাট নামে। তাঁর স্বপ্ন ছিল রাঙ্গালিবাজনায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আততায়ীর ছুরিতে প্রাণ হারানোয় অধরাই থেকে যায় তাঁর স্বপ্ন! গান্ধীবাদি আদর্শে দেশের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ যজ্ঞেশ্বর রায় মৃত্যু হয় ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ । তখন সবে সন্ধ্যে পেরিয়ছে । হাট থেকে বাড়ি ফেরার পথে আততায়ীর ধারালো অস্ত্রের পরপর আঘাতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।

এমএলএ-র হাটে যজ্ঞেশ্বরবাবুর আবক্ষ মূর্তি রয়েছে । কিন্তু প্রয়াত ওই  স্বাধীনতা সংগ্রামী অবহেলিতই থেকে যান স্বাধীনতা দিবসে। সেখানে কোনো নেতা, জনপ্রতিনিধি যান না। যজ্ঞেশ্বরবাবুর নাতি জয়প্রকাশ রায় বলেন, ” দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করলেও স্বাধীন ভারত তাঁকে প্রাপ্য মর্যাদা, সম্মান দেয়নি ।” এলাকার বাসিন্দা তথা দার্জিলিঙের সাউথফিল্ড কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক ড: দীনেশ রায় বলেন, ‘সরকারিভাবে যজ্ঞেশ্বর রায় প্রাপ্য সম্মান পাননি। তবে, ডুয়ার্সের প্রবীণ মানুষ ভালোভাবেই চেনেন তাঁকে। স্বীকার করেন তাঁর অবদানের কথা।’

ছবি – এমএলএর হাটে যজ্ঞেশ্বর রায়ের আবক্ষ মূর্তি ।

তথ্য ও ছবি – মোস্তাক মোরশেদ হোসেন