বন্ধ মনসামঙ্গল, সংসার বাঁচাতে গান ছেড়ে সবজি বেচছেন উত্তম

316

সৌরভকুমার মিশ্র, হরিশ্চন্দ্রপুর: কখনও মা মনসা আবার কখনও বা বেহুলা, লখিন্দর সেজে মানুষকে আনন্দ দিতেন। তা থেকে যা রোজগার হত, সেই দিয়ে সংসারও চলত। কিন্তু এখন সেসব অতীত।

লকডাউনের জেরে মনসামঙ্গল গান বন্ধ। ফলে সংসার চালাতে্ পথে নামতে হয়েছে হরিশ্চন্দ্রপুরের উত্তম সিংকে। পেটের টানে সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে তাঁকে। কবে আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কবে আবার মঞ্চ কাঁপিয়ে মানুষকে আনন্দ দেবেন, সেই স্বপ্নই এখন দুচোখে। করোনা সংক্রমণের মারণ থাবার জেরে লকডাউন চলছে মাসখানেক ধরে। ব্যতিক্রম নয় পশ্চিমবঙ্গ। দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে বন্ধ হয়ে গিয়েছে সামাজিক অনুষ্ঠান। বন্ধ হয়ে গিয়েছে বাঙালির চিরাচরিত উত্সব এবং পুজোপার্বণ।

- Advertisement -

প্রভাব পড়েছে গ্রামবাংলার চিরাচরিত প্রথা মনসা গানের ওপরেও। লকডাউনের জেরে বন্ধ হয়ে গিয়েছে গ্রামবাংলার বিভিন্ন পাড়ার মনসা গান। এই পালাগানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রচুর পরিবার। সাধারণত বৈশাখ বা জ্যৈষ্ঠ মাসে এই গান হয়ে থাকে। গ্রামের অবস্থাপন্ন গৃহস্থরা এই পালার আয়োজন করে থাকেন। কিন্তু লকডাউনের জেরে সবই বন্ধ রাখতে হয়েছে। মনসা পালাগানের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত রয়েছেন, সংসার চালাতে তাঁদেরকে বিকল্প পেশা বেছে নিতে হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে মনসা পালাগানের সঙ্গে যুক্ত হরিশ্চন্দ্রপুর থানা এলাকার রাধানগর গ্রামের উত্তম সিং। যিনি মনসা গান পালাতে মা মনসা, লখিন্দর বা বেহুলা সেজে দর্শকদের মন জয় করেন। কিন্তু লকডাউনের জেরে বন্ধ হয়ে গিয়েছে পালাগান। তাই বন্ধ রোজগার। উপায় না দেখে বেছে নিতে হয়েছে সবজি বিক্রির কাজ। পালায় সাজা মনসা এখন সবজি বিক্রেতা। হরিশ্চন্দ্রপুর এলাকার বিভিন্ন হাটে ও দৈনিক বাজারে সবজি বিক্রি করেই সংসার চালাচ্ছেন উত্তমবাবু।

         

হরিশ্চন্দ্রপুর থানার হাটখোলা বাজারে সবজির দোকানে বসে বসেই বলেন, সাধারণত গ্রামবাংলায় সারাবছরই মনসা গান হয়ে থাকে। মূলত চৈত্র-বৈশাখ মাস থেকে পালার বায়না শুরু হয়ে যায়। হরিশ্চন্দ্রপুর থানা এলাকার বিভিন্ন গ্রামের অবস্থাপন্ন গৃহস্থরা বিভিন্ন সময় এই পালাগানের আয়োজন করে থাকেন। আমাদের দলে অভিনেতা, অভিনেত্রী, বাজনাদার, গায়ক সহ ২০ থেকে ২২ জন রয়েছেন। প্রত্যেকেই লকডাউনে কাজ হারিয়েছেন। আমি বিকল্প পেশা হিসাবে সবজি বিক্রি করছি। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাঁরা এখনও বিকল্প পেশা বেছে নিতে পারেননি। তাঁদের আর্থিক অবস্থাটা আমার থেকে আরও দুর্বল। অনেকেরই বয়স হয়ে গিয়েছে। ফলে তাঁরা অন্য কোনও কাজ করতে অসমর্থ। লকডাউনের জেরে তাঁরা চরম সমস্যায় পড়েছেন। মনসা গানে প্রত্যেক রাতে প্রতি শিল্পী ২০০ থেকে ২৫০ টাকা রোজগার করে থাকেন।  এখন তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

তিনি আরও জানান, এখন রোজ ভোররাতে চাঁচল কিংবা সামসীতে সবজির পাইকারি বাজার ধরতে হয়। সেখান থেকে সবজি নিয়ে এসে হরিশ্চন্দ্রপুরের বিভিন্ন মার্কেটে সবজি বিক্রি করি। আশায় আছি, এই সমস্যা খুব তাড়াতাড়ি মিটে যাবে। আবার আমরা আমাদের মনসা গানের দল নিয়ে গ্রামবাংলার গৃহস্থের উঠোনে নেমে পড়ব। স্থানীয শিক্ষক তপোব্রত মিশ্র বলেন, গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে এখনও সন্ধ্যা নামলে মনসা গানের পালা বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু লকডাউনের জেরে সামাজিক দূরত্বের কথা মাথায় রেখে এই পালা এখন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এর জেরে যেমন গ্রামবাংলার মানুষের মন খারাপ, তেমনই বিষন্নতার মধ্যে রযেেন মনসা গানের সঙ্গে জড়িত শিল্পীরাও।