ক্যানসার জয়ের স্বপ্ন দিনহাটার মোশারফের চোখে

441

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : মারণব্যাধি ক্যানসারকে করায়ত্ত করার ফর্মুলা কি হাতের নাগালেই? দিনহাটার প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণ গবেষক মোশারফ হোসেন এমনই আশার আলো দেখাচ্ছেন। গবেষণাগারে আবিষ্কৃত তাঁর সিন্থেটিক উপাদান ক্যানসারের কোষকে মেরে ফেলতে সক্ষম। দুধরনের ইঁদুরের শরীরে এই উপাদান প্রয়োগ করে দেখা গিয়েছে, তা ক্যানসারের কোষকে ১০০ শতাংশ মেরে ফেলতে পারছে। কোষের মৃত্যুর কারণে ক্যানসারের দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনায় ইতি।

ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে বেশ সাড়া ফেলা মোশারফের গবেষণাপত্র আমাদের দেশের পেটেন্ট কর্তৃপক্ষ তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। পদ্ধতিগতভাবে পেটেন্টের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এবার ধাপে ধাপে গিনিপিগ, বানর ও মানুষের শরীরে উপাদানের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পদক্ষেপ করা হবে। গিনিপিগের উপর প্রয়োগ করার অনুমতি থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামোতে পরবর্তী ধাপের পরীক্ষামূলক প্রয়োগগুলি কার্যত সম্ভব নয়। তবে গবেষণায় সাফল্যের সম্ভাবনা বুঝে বেশ কয়েকটি নামী ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা আগ্রহ দেখিয়েছে বলে মোশারফ জানিয়েছেন। পরীক্ষা সফল হলে তাঁর আবিষ্কার ব্যবসায়িকভাবে ওষুধ হিসাবে বাজারে আসতে পারে।

- Advertisement -

মোশারফ বর্তমানে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি-এর মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগের সহকারী ডিরেক্টর পদে কর্মরত। তাঁর এই কাজের সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন খুশির হাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার তথা রসায়নের অধ্যাপক প্রণব ঘোষ বলছেন, মোশারফের এই গবেষণা মানুষের উপকারে লাগবে। সমস্ত গবেষককে উৎসাহিত করার পাশাপাশি তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক মানোন্নয়নও করবে। পরবর্তীতে এই গবেষণার কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমরা সবরকম সহযোগিতাই করব।

ক্যানসার জয়ের স্বপ্ন দিনহাটার মোশারফের চোখে| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaদিনহাটার প্রত্যন্ত গ্রাম দ্বারিকামারির মোশারফ পেটলার নবিবকস উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং দিনহাটা শনিদেবী জৈন হাইস্কুল থেকে বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর রসায়ন নিয়ে  পড়াশোনার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক লাভ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক আশিসকুমার নন্দার তত্ত্বাবধানে সিন্থেটিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি নিয়ে গবেষণার সুবাদে ২০১৮ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি। মোশারফ বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউজিসির মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগের সহকারী ডিরেক্টর পদে কর্মরত রয়েছেন।

ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দিশাটা কীভাবে খুঁজে পাওয়া গেল? মোশারফ জানাচ্ছেন, সিন্থেটিক ড্রাগ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু উপাদান খুঁজে পান যেগুলি মানবদেহের কোষকে মেরে ফেলে। তখনই ক্যানসার কোষ মেরে ফেলার বিষয়টি তাঁর মাথায় আসে। সাধারণ কোষ ও ক্যানসার কোষ দুই ধরনের কোষের উপর সেই উপাদানগুলি প্রয়োগের ফলে দেখা যায়, উপাদানগুলি দুই ধরনের কোষকেই ৯০ শতাংশের বেশি মেরে ফেলছে। তবে সেগুলির মধ্যে নির্দিষ্ট একটি উপাদান শুধুমাত্র ক্যানসার কোষকেই ৭০ শতাংশের বেশি মেরে ফেলতে সক্ষম। তখন সেই উপাদানটি নিয়ে ধাপে ধাপে গবেষণার এগিয়ে যাওয়া শুরু। গবেষণার প্রথম ধাপ ইনভিট্রো। এই পর্যায়ে বিশ্লেষণ করে দেখা হয় উপাদানটি মানবদেহে প্রয়োগের উপযুক্ত কি না বা কতটা কার্যকর। উপযুক্ত হলে উপাদানটি সাধারণ কোষ ও ক্যানসার কোষে প্রয়োগ করে দুই ক্ষেত্রের তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয়। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনলজির ল্যাবরেটরিতেই ওই পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করা হয়। বায়োটেকনলজি ও বটানি বিভাগের একদল অধ্যাপক, গবেষক ওই কাজে সহায়তা করেন। স্তন, ফুসফুস, জরাযু ও লিভার ক্যানসার কোষের উপর উপাদানের প্রয়োগ ও পর্যালোচনা করা হয়। দেখা যায়, মানবদেহে উপাদানটি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

গবেষণার দ্বিতীয় ধাপ ফ্লুওরেসেন্স এবং তৃতীয় ধাপ মরফোলজিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দুই ধাপে দেখা হয়, উপাদানটি কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে কি না এবং কোষে ঢোকার পর কতটা কাজ করছে। পরীক্ষায় দেখা যায়, উপাদানটি শুধুমাত্র ক্যানসার কোষেই ঢুকছে। সাধারণ কোষে ঢুকছে না। ফলে সাধারণ কোষের ক্ষতির কোনও সম্ভাবনাই নেই। কোষে ঢোকার পর দ্রুত আক্রান্ত কোষটিকে নষ্ট করছে এবং সেই জায়গায় নতুন কোষের জন্ম হচ্ছে। এর পরের ধাপ ইনসিলিকো স্টাডিজ। কোনও ওষুধ আমাদের শরীরে ঢুকে যত বেশি কোষের প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে সেই ওষুধ তত বেশি কার্যকর হয়। ইনসিলিকো স্টাডিজ-এ সেটাই দেখা হয়। এক্ষেত্রে পরীক্ষা করে দেখা যায়, মানবদেহের erbB2 নামক প্রোটিনের সঙ্গে উপাদানটির সব থেকে ভালো সংযোগ হচ্ছে। ফলে মানবদেহে উপাদানটি অত্যন্ত কার্যকর হবে।

সব শেষের ধাপ  ইনভিভো স্টাডিজ। এখানে  ছোট ও বড় দুই ধরনের ইঁদুরের উপর উপাদান প্রয়োগ করা হয়। একই ধরনের ইঁদুরের চারটি করে মোট আটটি দল তৈরি করা হয়। প্রতি দলে ছয়টি করে ইঁদুর রাখা হয়েছিল। প্রথমে কৃত্রিমভাবে ইঁদুরগুলির শরীরে ক্যানসারের সৃষ্টি করা হয়। তারপর সেগুলির ওপর মোশারফের আবিষ্কার করা উপাদান প্রয়োগ হয়। নানা মাত্রায় উপাদানের অনেকগুলো ডোজ তৈরি করে বিভিন্ন সময় সেগুলি প্রয়োগ করা হয়। প্রায় ছয় মাস ধরে এই পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ চলে। মোশারফ বলেন, দেখা যায়, উপাদান প্রয়োগের ফলে ইঁদুরগুলির শরীর থেকে ক্যানসার ১০০ শতাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। মানব কোষে প্রয়োগে উপাদানটির কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও যে নেই, সেটাও ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।