নতুন সূর্যোদয়ের স্বপ্ন দেখেন কৃষিরত্ন শ্যামচন্দ্র

সানি সরকার, শিলিগুড়ি : বিকল্প চাষের সন্ধানে জিরো টিলেজ হাতে নিয়ে তিনি যখন জমিতে পা রেখেছিলেন, তখন অনেকেই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলেন। ছেলেটা করছেটা কী, এভাবে চাষ হয় নাকি- এমন প্রশ্নও করছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু পাঁচ বছর পেরিয়ে উত্তর দিনাজপুর জেলার করণদিঘিকে নতুন করে স্বনির্ভরতার পাঠ দিচ্ছেন সেই শ্যামচন্দ্র লালা। জৈব চাষে নতুন বিপ্লব ঘটানোয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন কৃষিরত্ন পুরস্কার। কিন্তু লড়াইটা এখনও শেষ হয়নি, বলছেন শ্যামচন্দ্র লালা।

পাঁচজনের সংসারের হাল ধরাটাই একটা সময় ছিল জীবন সংগ্রাম। তাই বাবা অমলচন্দ্র লালার দেখানো পথে হেঁটে লাঙল নিয়ে জমিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পাঁচ বছর পেরিয়ে এখন নতুন প্রজন্মকে চাষের খেতে নিয়ে যাওয়াটাকেই ব্রত করে ফেলেছেন উত্তর দিনাজপুর জেলার করণদিঘির মাছের গ্রামের বাসিন্দা শ্যামচন্দ্র লালা। তাঁকে অবশ্য বেশিদিন লাঙল টানতে হয়নি। সাবেক প্রথা ছেড়ে বিনা কর্ষণে কীভাবে চাষ সম্ভব, তা জানতে পেরেছিলেন কৃষি দপ্তর আয়োজিত একটি আলোচনা সভায় গিয়ে। সাধারণ চাষী থেকে কৃষিরত্ন হওয়ার পথে তখন থেকেই যাত্রা শুরু। কৃষিবিজ্ঞানী অঞ্জলি শর্মা ও ধনঞ্জয় মণ্ডলের থেকে হাতেকলমে তালিম পেয়ে শ্যামচন্দ্র চাষের মাঠে নেমে পড়েন জিরো টিলেজ নিয়ে।

- Advertisement -

বিনা কর্ষণে জৈব পদ্ধতিতে বিভিন্ন ডাল চাষ করে তিনি এক বছরের মধ্যেই রাজ্য সরকারের কৃষিরত্ন সম্মান পেয়েছেন। বিনা কর্ষণে গম চাষের সাফল্যের স্বীকৃতি তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের থেকেও পেয়েছেন। ২০১৪ সালে গুজরাটে তাঁকে স্মারক এবং আর্থিক পুরস্কার দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের থেকে কাজের স্বীকৃতি পেয়ে শ্রী পদ্ধতিতে ধান চাষের সঙ্গে তিনি সবজিও চাষ করেন। ধনিয়াপাতা, ঝিঙে, করলা চাষ করে বাড়তি উপার্জন করেন শ্যাম। কেন্দ্রীয কৃষি দপ্তরের তরফে তাঁকে নতুন করে পুরস্কৃত করা হয়। পাশাপাশি, রাজ্যের তরফে ২০১৩ সালের পর ২০১৪ এবং ২০১৫ সালেও তাঁকে কৃষিরত্ন পুরস্কার দেওয়া হয়। রাজ্যের সেরা কৃষক মনোনীত হয়েছেন এ বছরও। কিছুদিনের মধ্যে তাঁকে পুরস্কার দেবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

একের পর এক সাফল্যের স্বীকৃতি পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই খুশি শ্যামচন্দ্র লালা। কিন্তু লড়াইটা শেষ হয়ে যায়নি, বলছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, কাদা-মাটি শরীরে লাগবে বলে এখনকার ছেলেরা মাঠে যেতে চায় না। কিন্তু বিনা কর্ষণে জৈব চাষ যে সম্ভব এবং এর ফলে আত্মনির্ভর হওয়া যায়, সেই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। অনেকেই উদ্বুদ্ধ হয়েছে। আরও অনেককে করতে হবে। বাংলার পরিচয় তো শস্যশ্যামলার মধ্যে দিয়ে। শিলিগুড়িতে নিজের জমিতে তৈরি ডাল, আম বিক্রি করার ফাঁকে তিনি জানান, এখন আর আর্থিক কোনো কষ্ট নেই। বরং দিনের শেষে পরিবারের সকলের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখে ঘুমোতে যান। শুধুমাত্র তুলাইপাঞ্জি চাষ করেই কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর পরিচয়ের ব্যাপ্তি ঘটেছে। দেশের কৃষি মানচিত্রেও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে করণদিঘি। কিন্তু শ্যামচন্দ্র লালা বলেন, গ্রামের ১০টি বাড়ি থেকে একজন করে যেদিন জিরো টিলেজ নিয়ে মাঠে যাবে, সেদিনই লড়াই সার্থক হবে।

প্রতি রাতে এমনই নতুন সূর্যোদয়ের স্বপ্ন দেখেন করণদিঘির কৃষিরত্ন।