কিডনিতে পাথর হওয়া রুখতে জল পান করুন

আমাদের ইউরিনারি সিস্টেম কিডনি, মূত্রাশয়, মূত্রথলি ও মূত্রনালি নিয়ে গঠিত। কিডনি হল এমন একটি অঙ্গ, যার সাহায্যে দেহের বর্জ্য প্রস্রাব আকারে বেরিয়ে যায়। আমাদের শরীরে দুটো কিডনি থাকে। মূত্রনালি কিডনি থেকে মূত্রথলি অবধি ইউরিন বয়ে নিয়ে যায়। প্রস্রাব না হওয়া অবধি মূত্রথলিতে প্রস্রাব জমা থাকে। এটা ইউরেথ্রা নামক নল দিয়ে শরীরের বাইরে চলে যায়। ইউরিনারি সিস্টেমের যে কোনও জায়গায় পাথর হতে পারে। এটা তখনই হয় যখন প্রস্রাবে কিছু রাসায়নিক ক্রিস্টালের রূপ নেয় এবং একসঙ্গে লেগে থাকে। এরপর সেই ক্রিস্টাল পাথরের আকার নেয়, যা বালির দানা থেকে শুরু করে গলফ বলের আকারের হতে পারে। ছোট পাথর, যার আকার সাধারণত ৫ মিলিমিটার হয়, খুব বেশি সমস্যা ছাড়াই ইউরিনারি সিস্টেমের মাধ্যমে বেরিয়ে যেতে পারে।  অন্যদিকে, বড় পাথরের কারণে প্রস্রাবের গতি বাধা পেতে পারে এবং মূত্রনালির আস্তরণ জ্বলতে পারে। ৭০-৮০ শতাংশ পাথর ক্যালসিয়াম অক্সালেট ক্রিস্টালের হয়। কিছু ছোট পাথর ইউরিক অ্যাসিড বা সিসটিনের হয়।

কিডনিতে পাথর হওয়ার কারণ

- Advertisement -

সাধারণত প্রস্রাবে রাসায়নিক থাকে, যা ক্রিস্টাল তৈরিতে বাধা দেয়। বারবার মূত্রনালিতে সংক্রমণ, কম জল খাওয়া, মূত্রনালি আটকে যাওয়া ইত্যাদি কারণে পাথর হতে পারে। এছাড়া খাবারে খুব বেশি অক্সালেট বা ইউরিক অ্যাসিড রাখা, অতিরিক্ত ভিটামিন সি বা ডি নেওয়া, নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ এবং বিপাকীয় রোগের থেকে কিডনিতে পাথর হতে পারে।

পাথর হওয়ার লক্ষণ

কিডনিতে পাথর কোনও লক্ষণ ছাড়াই অনেকদিন পর্যন্ত থাকতে পারে। প্রধানত মারাত্মক ব্যথা হতে পারে, যেটা হঠাৎই কোমর থেকে শুরু হতে পারে বা তলপেটে হতে পারে এবং কুঁচকির দিকে চলে যায়। প্রায়শই ব্যথার সঙ্গে বমি হতে পারে। এই ব্যথা কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে। ধীরে ধীরে স্বস্তি বোধ হয়। পাথরের কারণে প্রস্রাবে রক্ত দেখা দিতে পারে। যদি মূত্রনালিতে সংক্রমণ হয়, তাহলে প্রস্রাব করার সময় জ্বলতে পারে।

রোগনির্ণয়

কিডনিতে পাথর হয়েছে কি না বুঝতে সম্পূর্ণ মেডিকেল পরীক্ষা, এক্সরে এবং অন্যান্য টেস্ট করা হয়। চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা করার পাশাপাশি আগে কিডনিতে কোনও সমস্যা হয়েছে কি না, রোগী কী ওষুধ খান, পারিবারিক ইতিহাস ইত্যাদি জানতে চান। কিডনি, মূত্রাশয়, মূত্রথলি অঞ্চল সহ পেটের এক্সরেতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্টোন অস্পষ্ট থাকে। তখন সনোগ্রাফি করা হয়। এছাড়া রক্তপরীক্ষা যেমন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা এবং ইউরিন টেস্ট করার প্রয়োজন হতে পারে।

পাথর হওয়ার চিকিৎসা

বেশিরভাগ ছোট পাথর, যেগুলির আকার ৫ মিমি, কয়েক ঘণ্টা বা কয়েকদিনের মধ্যে একাই বেরিয়ে যায়। প্রচুর পরিমাণে জল খাওয়া এই প্রক্রিয়াকে সহজ করতে পারে।  কিছু পাথর ওষুধেই গলে যায়। যদিও বেশিরভাগ পাথর, যেগুলোয় ক্যালসিয়াম থাকে সেগুলো সহজে গলে না। কিছু পাথর নিজে থেকে গলে না এবং মূত্রনালিতে বাধা তৈরি করে। সেক্ষেত্রে ব্যথা, অস্বস্তি, কিডনি ফুলে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। এরকম হলে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন। চিকিৎসার একটি উপায় হল, নন-সার্জিক্যাল, যাকে এক্সট্রা কর্পোরিয়েল শক ওয়ে লিথোট্রিপসি (ইএসডব্লিউএল) বলা হয়। এই পদ্ধতিতে উচ্চশক্তির শক দিয়ে পাথরগুলো বালির মতো ছোট ছোট টুকরোয় ভাঙা হয়। এরপর পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই পাথরের গুঁড়ো প্রস্রাব দিয়ে বেরিয়ে যায়। এই চিকিৎসা পদ্ধতি সফলভাবে সেইসব ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, যেখানে পাথরের আকার তুলনামূলক ছোট। অপর পদ্ধতি হল অস্ত্রোপচার, যেখানে এন্ডোস্কোপ (ইউরেটেরোস্কপি, নেফ্রোস্কপি) ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড ওপেন টেকনিক।

সতর্কতা

কিডনিতে যাতে পাথর না হয় তার জন্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে। যদি কোনও শারীরিক সমস্যা না থাকে, তাহলে প্রতিদিন অন্তত ২ লিটার জল খান এবং কম লবণযুক্ত খাবার খান। ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথরের ক্ষেত্রে ডেয়ারি প্রোডাক্ট এবং যেসব খাবারে উচ্চমাত্রায় অক্সালেট রয়েছে যেমন চা, চকোলেট ইত্যাদি খাওয়া উচিত নয়। ইউরিক অ্যাসিডযুক্ত পাথরের ক্ষেত্রে রেড মিট খাওয়া কমিয়ে দিন।