শুভজিৎ দত্ত, নাগরাকাটা : প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের তুলনা নেই। তার টানে পর্যটকদের আনাগোনাও থাকে বছরভর। তবু পানীয় জলের মারাত্মক সংকটে জেরবার নাগরাকাটার লালঝামেলা বস্তি। পর্যটকরা জল চাইলে সত্যিই লজ্জায় পড়ে যান এখানকার হাজার পাঁচেক বাসিন্দা। রিগবোর টিউবওয়েলের আয়রনমিশ্রিত বা নদী-ঝোরার অপরিস্রুত জল এখানকার বাসিন্দাদের ভরসা। পানীয় জল ইশ্যুতে ক্ষুব্ধ এলাকার মানুষ চাইছেন সমস্যা সমাধানে জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তর এগিয়ে আসুক। নাগরাকাটার বিডিও স্মৃতা সুব্বা বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে লালঝামেলা বস্তিতে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর অনেক নীচে। তাই রিগবোর টিউবওয়েল তৈরি করলেও তা কার্যকর হয় না। পিএইচইর কাছে প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো আছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, লালঝামেলা বস্তিতে সবমিলিয়ে ১৮টি রিগবোর টিউবওয়েল আছে। সেগুলির বেশিরভাগই অধিকাংশ সময় বিকল হয়ে থাকে। যখন সচল থাকে তখন আবার সেগুলি থেকে আয়রনমিশ্রিত লাল জল পড়ে। গ্রামের স্কুল, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র থেকে শুরু করে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র সর্বত্রই রোগী থেকে স্কুল পড়ুয়া বা প্রসূতিদের সেই জল খেতে হয়। তার উপর শীতের শুখা মরশুম শুরু হতেই ফি বছরের মতো এবারও জলের জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। বাধ্য হয়ে বাসিন্দাদের অনেকেই পাশের ডায়না নদী থেকে জল নিয়ে আসছেন। স্কুল কামাই করে এলাকার ছাত্রছাত্রীদেরও এখন বাড়িতে ওই কাজে সাহায্য করতে হচ্ছে।

জলসমস্যার সমাধানে প্রায় ১৫ বছর আগে এখানে সজলধারা প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। তবে গত এক বছর ধরে ওই ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে আছে। বিদ্যুতের বিল দিতে না পারার কারণে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভুটান লাগোয়া এলাকার কয়েকটি বাড়ি নিজেদের উদ্যোগে সেদেশের একটি ঝরনা থেকে পাইপ দিয়ে জল আনার ব্যবস্থা করেছেন। তবে তাতে উপকৃত হচ্ছেন বড়োজোর ৫-৬টি পরিবার। বাকিদের পরিস্থিতি শোচনীয়। এলাকার গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য অসিত কুজুর বলেন, জন্ম থেকেই এখানে জলসমস্যা দেখে চলেছি। ভাগ্যিস পাশে ডায়না নদী রয়েছে। অপরিস্রুত সেই জলই বছরের অনেকটা সময় হাজার পাঁচেক বাসিন্দার ভরসা। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের প্রকল্প না হলে লালঝামেলার পানীয় জলসংকট কোনোদিন মিটবে না। কিন্তু নানা মহলে বিষয়টি জানিয়ে লাভ হয়নি। প্রিয়াংকা ছেত্রী নামে গ্রামের এক কলেজ ছাত্রী বলেন, অনেকেই স্কুলে যাওয়া ছেড়ে জল আনতে নদীতে যায়। বাঁচার জন্য এছাড়া আর কী বা করার আছে। অমৃত ছেত্রী নামে এক বাসিন্দা বলেন, জলের স্তর এতটাই নীচে যে টিউবওয়েল পাম্প করতে গিয়ে হাঁফ ধরে যায়। যতটুকু জল মেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা আয়রন মেশা। বাধ্য হয়ে নদী-ঝোরার জল ছেঁকে পান করেন অনেকেই। এলাকার একমাত্র প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক রমেশচন্দ্র দাস বলেন, আমাদের ছাত্রসংখ্যা আড়াইশোর কাছাকাছি। অথচ স্কুলে জলের কোনো ব্যবস্থা নেই। ভরসা বাইরের একটি টিউবওয়েল। সেটা থেকেও আবার সবসমযে জল মেলে না। মিড-ডে মিল রান্নায় যে কী ভোগান্তি হয় তা একমাত্র আমরাই জানি।

লালঝামেলার পিকনিক স্পটটিতেও আজ পর্যন্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা হয়নি। ফলে পর্যটকরাও এখানে এসে সমস্যায় পড়েন। পিএইচইর জলপাইগুড়ির এগ্জিকিউটিভ ইঞ্জিনিযার দেবাশিস সরকার বলেন, লালঝামেলায় জলপ্রকল্প রূপায়ণে কোনো নির্দেশিকা আসেনি। এলেই পদক্ষেপ করা হবে।