শিলিগুড়ি শহরে বাড়ছে নেশাড়ু, উদ্বেগে মহিলারা

140

পারমিতা রায়, শিলিগুড়ি : হাতি মোড় থেকে কোর্ট মোড় যাওয়ার কথা ছিল। ওইজন্যই টোটোয় চাপা। কত দূর আর হবে?  মেরেকেটে খুব বেশি হলে ৭০০ থেকে ৮০০ মিটার। কিন্তু তৃণা ভট্টাচার্যকে একপ্রকার বাধ্য হয়ে বাঘা যতীন পার্কের সামনে নেমে পড়তে হল। কেননা হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল সহযাত্রী এক তরুণের দিকে। নেশায় চোখ লাল। গন্ধে ভরে যাচ্ছে চারদিক। ওই ভয়ংকর লালচোখেই বারবার তাকাচ্ছে সহযাত্রিণীর দিকে।

এটা শুধু আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় শিলিগুড়িতে। শুধু তৃণা নন, এমন দুঃসহ অভিজ্ঞতার শিকার উত্তর ভারতনগরের পিয়ালি সরকার, হাকিমপাড়ার দেবযানী মিত্রদের মতো অনেক মহিলাই। কেউ প্রতিবাদী হয়ে টোটোচালককে সতর্ক করেছেন। কেউ আবার প্রতিবাদে তেমন কাজ হবে না মনে করে মাঝরাস্তায় নেমে গিয়েছেন।

- Advertisement -

নেশায় অল্পবয়সিদের আসক্তি যেভাবে বাড়ছে, তাতে শহরের অনেক মহিলাই আতঙ্কিত এখন। এমন ঘটনাকে যেমন সামাজিক অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন অনেকে, তেমনই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে পথ নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। কেন তারা নেশাড়ুদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিতে পারছে না? পুলিশের এক আধিকারিক প্রশ্ন শুনে বললেন, সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নজর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নজরদারিও রাখা হবে। সেটা আদৌ কি হবে, প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

ভোটবাজারে যুব সম্প্রদায়ের দিকে তাকিয়ে রাজনৈতিক দলগুলি। যুবরা ভোটভাগ্য গড়ে দিতে পারেন বুঝতে পেরে সব দল যুবরা দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ স্লোগানকে সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু শিলিগুড়িতে এক শ্রেণির তরুণ-যুবক যেভাবে নেশার শিকার হচ্ছেন, তাতে রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সামাজিক অবক্ষয় রোধে রাজনৈতিক দলগুলির চোখরাঙানিতে অনেক কাজ হয়। এখানে নেতারা চুপ কেন? সূর্যনগরের তাপসকান্তি বসু যেমন বললেন, অল্পবয়সিদের ভুলটা ধরিয়ে দিতে রাজনৈতিক দলগুলি যদি শিবির করে, তবে কাজ হবে বলে মনে করি। কিন্তু কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না।

শহরে নেশার প্রতি ঝোঁক বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শহরের সদ্যপ্রাক্তন মেয়র অশোক ভট্টাচার্য। ব্যাপারটা মেনে নিয়ে তাঁর মন্তব্য, এখন শহরে যুব সম্প্রদায় নেশার দ্রব্যের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে, তা একদম সত্যি। বিষয়টি নিয়ে আমরা উদ্বেগেই রয়েছি।  তবে এ ব্যাপারে পুলিশের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। রাজ্যের ক্ষমতায় যে সরকার আসবে, তাদের এই বিষয়ে পদক্ষেপ করতে হবে।

এই ধরনের ঘটনা ক্রমশ বাড়তে থাকায় চিন্তিত অনেক অভিভাবক। শহরের বিভিন্ন জায়গায় এখন দিনদুপুরে বিভিন্ন নেশা করতে অল্পবয়সি ছেলেমেয়েছের দেখা যায় বলে মানছেন অনেকে। যথারীতি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিভিন্ন অসামাজিক কাজকর্ম। একের পর এক চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে ফুলেশ্বরী সহ অনেক এলাকাতেই। কিছুদিন আগে ওই এলাকায় নেশার ঠেকের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছিল বিজেপি। ডিওয়াইএফআই-ও একাধিক কর্মসূচি নিয়েছে। পুরোমাত্রায় বন্ধ না হলেও কিছুটা কাজ হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

শহরের তরুণী ইশা বোস বলেন, অনেক সময়ই রাস্তায় কমবয়সি ছেলেদের নেশা করতে দেখি। অনেক সময় কটূক্তির মুখে পড়তে হয়। রাগ হলেও কিছু করতে পারি না। যা চলছে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকারক। তাই কমবয়সি ছেলেমেয়েদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। গৃহবধূ প্রিয়াঙ্কা রায়ের মন্তব্য, এমন ছেলেমেয়েছের জন্য অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে। যেভাবে নেশার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে সমাজের ক্ষতিও হচ্ছে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত পদক্ষেপ করা। পেশায় শিক্ষক রাহুল বিশ্বাসের বক্তব্য, যুব সম্প্রদায় যেভাবে মাদকদ্রব্য সেবনে আসক্ত হচ্ছে, তাতে তাদের ভবিষ্যৎও নষ্ট করে দিচ্ছে।
প্রশ্ন হল, বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? নাকি তৃণাদের মতো অনেক তরুণীকে মাঝরাস্তাতেই টোটো থেকে নেমে যেতে হবে বারবার?