রাফালের শব্দই আতঙ্ক, বধির বহু হাসিমারায়

194

সমীর দাস হাসিমারা : না, আপাতত যুদ্ধের কোনও আভাস নেই। তবু ভোর হতেই এখানে শুরু হয় যুদ্ধবিমান রাফালের তর্জন-গর্জন। যে রাফাল নিয়ে দেশবাসীর এত গর্ব, সেই রাফালই এখন আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে আলিপুরদুয়ার জেলার হাসিমারা বায়ুসেনা ছাউনি সংলগ্ন এলাকার কয়েক লক্ষ মানুষের। যুদ্ধবিমানের কান ঝালাপালা করে দেওয়া শব্দে বধিরতা বাড়ছে কয়েকটি গ্রামে। স্থানীয় পরিসংখ্যান বলছে, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ৯০ শতাংশ মানুষই কমবেশি কানে শুনতে পান না। এভাবে চলতে থাকলে এই হার একশোয় পৌঁছাতে খুব বেশিদিন লাগবে না বলেই মনে করছেন চিকিৎসকরা।

হাসিমারার এই সমস্যা অবশ্য বছর পঞ্চাশের পুরোনো। ১৯৬৩ সালে এই বায়ুসেনা ছাউনি চালুর পর থেকেই যুদ্ধবিমানের আওয়াজ শোনা যেন রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই অঞ্চলের মানুষের। কিন্তু তখন এই অঞ্চলে ঘন জনবসতি না থাকায় সমস্যা সীমিত ছিল। ধীরে ধীরে কলেবরে বেড়েছে হাসিমারা। বেড়েছে যুব্ধবিমানের আনাগোনাও। মিগ ছেড়ে এখন এখানে আস্তানা গেড়েছে যুদ্ধবিমান রাফাল। হাসিমারা হয়ে উঠেছে ভারতের দ্বিতীয় রাফাল স্কোয়াড্রন। দেশের প্রতিরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে এটা অবশ্যই গর্বের। কিন্তু যেভাবে এই অঞ্চলের মানুষ বধির হয়ে যাচ্ছেন, তা তো উদ্বেগেরও বটে। রাফাল যুদ্ধবিমানের রানওয়ে তৈরির জন্য প্রায় দুবছর হাসিমারা বায়ুসেনা ঘাঁটিতে মহড়া বন্ধ রেখেছিল প্রতিরক্ষামন্ত্রক। রাফাল হাসিমারার মাটি ছোঁয়ার পর থেকেই ফের শুরু হয়েছে উড্ডয়ন। তারপর থেকেই সমস্যা আরও তীব্রতর হয়েছে।

- Advertisement -

নয়ের দশকের কথা। তত্কালীন রাজ্য সরকারের তরফে কলকাতার প্রখ্যাত চিকিৎসক আবিরলাল মুখোপাধ্যায় এসে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন হাসিমারার আশপাশের গ্রামগুলিতে। প্রত্যেক গ্রামবাসীর কান পরীক্ষার পাশাপাশি বধিরদের নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন। ব্যাস, ওই পর্যন্তই। তারপর এই মানুষগুলোর কথা আর কেউ ভাবেনি। প্রাক্তন বিধায়ক পবন লাকড়া বলছেন, দিন-রাত যুদ্ধবিমানের মহড়া চলায় আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ জন্মের পর থেকেই কানে কম শুনতে পায়। এর জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রক গ্রামবাসীদের চিকিৎসা তো দূরের কথা, কোনও ক্ষতিপূরণও দিচ্ছে না।

হাসিমারা বায়ুসেনা ছাউনির খুব কাছেই রয়েছে পূর্ব সাতালি, মেন্দাবাড়ি, লতাবাড়ি, মালঙ্গি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকা। রয়েছে একাধিক চা বাগান। সবমিলিয়ে কয়েক লক্ষ লোকের বাস। অধিকাংশই নিম্নবিত্ত পরিবারের। ফলে ধীরে ধীরে বধিরতা গ্রাস করলেও চিকিৎসার আলো থেকে তাঁরা যেন শত যোজন দূরে। কথা হচ্ছিল কালচিনি পঞ্চায়েত সমিতির প্রাক্তন সভাপতি সত্যেন মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি জানালেন, যুব্ধবিমানগুলি যাতে বিস্তীর্ণ এলাকার আকাশপথে মহড়া দেয়, তাহলে এই শব্দদানব-এর হাত থেকে কিছুটা রেহাই মিলবে। বিষয়টি একাধিকবার প্রতিরক্ষামন্ত্রকে জানানো হয়েছে। কিন্তু সুরাহা হয়নি। তিনি বলছেন, দেশের প্রতিরক্ষার সঙ্গে কোনও আপস নয়, তবে আমরা চাইছি যুদ্ধবিমানগুলি ছড়িয়েছিটিয়ে মহড়া দিক। এতে কিছুটা হলেও সমস্যার সমাধান হতে পারে। এছাড়াও স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে এলাকার কয়েকটি গ্রামে সমীক্ষা চালালে কতজন গ্রামবাসী বধিরতায় ভুগছেন তার সঠিক তথ্য প্রকাশ্যে আসবে।

বড়রা যেমন তেমন, এখানকার অনেক শিশুই বধিরতার সমস্যা নিয়ে ভূমিষ্ঠ হচ্ছে। বাড়ছে হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যাও। গ্রামে গ্রামে ঘুরলেই সেই তথ্য উঠে আসছে। শুধু তাই নয়, দিনভর যুদ্ধবিমানের বিকট আওয়াজে বাড়ছে মানসিক রোগও। একটুতেই তিতিবিরক্ত হয়ে উঠছে শিশুরা। কিন্তু সরকারিভাবে তার কোনও পরিসংখ্যান নেই। থাকবেই বা কী করে!

এই অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার ভরসা লতাবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতাল। কিন্তু সেখানে নাক-কান-গলার বিশেষজ্ঞ কোনও চিকিৎসক নেই। ফলে যাঁদের সামথর্য রয়েছে তাঁরা চিকিৎসা করাতে ছুটছেন আলিপুরদুয়ারে। আর যাঁদের নেই, তাঁরা সমস্যা নিয়ে দিন গুজরান করছেন। গ্রামবাসীরা জানাচ্ছেন, এখন কেউ কেউ অত্যাধুনিক শ্রবণযন্ত্র ব্যবহার করছেন। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের কাছে শ্রবণযন্ত্র কেনা তো দূরের কথা, ঠিকমতো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখানোও সম্ভব নয়। সুভাষিণী চা বাগানে বাড়ি ওই এলাকার পঞ্চায়েত সদস্য শিব চিকবড়াইকের। তিনি বলেন, বধিরতার সমস্যা তো এলাকায় রয়েছেই। তবে এখনও অবধি গ্রামবাসীদের কেউই আমাকে লিখিতভাবে কোনও সমস্যার কথা জানায়নি।

এখানে যুদ্ধবিমানের মহড়া বন্ধ হোক, এটা হয়তো কেউই চাইছেন না।  কিন্তু সরকার একটু তাঁদের দিকে মুখ তুলে তাকাক, এটাই এখন দাবি এই অঞ্চলের মানুষের।কালচিনির বিডিও প্রশান্ত বর্মনের কথায়, আমার কাছে এখনও কেউ অভিযোগ জানায়নি। অভিযোগ পেলে গুরুত্ব দিয়ে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

কয়েক মাস আগেও হাসিমারার এই বায়ুসেনা ঘাঁটিতে পা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছেন দেশের সর্বশক্তিমান যুদ্ধবিমান রাফালকে। কিন্তু এই প্রদীপের এত কাছেই যে অন্ধকার তা কি তিনি জানেন? এই লাখ টাকার প্রশ্নটাই এখন ঘুরছে হাসিমারার আনাচকানাচে।