উত্তরবঙ্গে করোনা পর্বের পাঁচ মাসে কোমর ভেঙেছে ব্যবসার

650

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: ২৪ মার্চ থেকে শুরু হয়েছিল লকডাউন। আনলক প্রক্রিয়া চালুর পরও স্বাভাবিক হয়নি ব্যবসা। গত পাঁচ মাসের হিসাবে উত্তরের সব জেলাতেই ওষুধ বাদে বাকি ব্যবসা চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সব মিলিয়ে করোনায় উত্তরবঙ্গের আর্থিক বুনিয়াদের কোমর ভেঙে গিয়েছে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের পরিসংখ্যান অনুসারে, গত পাঁচ মাসে আট জেলায় ক্ষতি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। পুজোর মুখে মুখ থুবড়ে পড়েছেন ছোট ব্যবসায়ীরা। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে। কীভাবে হাল ফেরাবেন, তা বুঝতেই পারছেন না ব্যবসায়ীরা। উত্তরবঙ্গে ব্যবসার কেন্দ্রস্থল শিলিগুড়ি।

শুধু উত্তরের বিভিন্ন জেলা নয়, শিলিগুড়ির সঙ্গে দার্জিলিং পাহাড়, সিকিম সহ প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের একটা বড় অংশের ব্যবসায়িক লেনদেন আছে। স্বাভাবিকভাবে কোভিড পরিস্থিতিতে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিলিগুড়ির ব্যবসা। বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের তথ্য অনুসারে, গত পাঁচ মাসের গড় হিসাবে শিলিগুড়িতে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে ২৩৬৫ কোটি টাকা। কোভিডে ব্যবসার পরিস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি সমীক্ষা করেছে উত্তরবঙ্গের ১২১টি ব্যবসায়ী সংগঠনের যৌথ মঞ্চ ইস্টার্ন এবিসি চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। তাদের হিসাবে, গত পাঁচ মাসের মধ্যে এক মাস নানা কারণে কোনও ব্যবসা হয়নি। বাকি চার মাসেও প্রতিদিন ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে।

- Advertisement -

সমীক্ষা রিপোর্ট অনুসারে, উত্তরবঙ্গের সবথেকে বড় পাইকারি বাজার শিলিগুড়ির নয়াবাজারে প্রতিদিন গড়ে ৪০ কোটি টাকার ব্যবসা হত। গত পাঁচ মাসে য়া কমে হয়েছে দিনে গড়ে ৩০ কোটি টাকা। বিধান মার্কেটে দিনে গড়ে ৪ কোটি টাকার ব্যবসা হত। সেটা নেমে গিয়েছে ১ কোটিতে। হার্ডওয়্যার সামগ্রীর ক্ষেত্রে দিনে ৬ কোটি টাকার ব্যবসা কমে হয়েছে ৩ কোটি। অন্য সময়ে শিলিগুড়ি শহরে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটি টাকার কাপড়ের ব্যবসা হত। করোনার প্রভাবে যেটা কমে দাঁড়িয়েছে ৮০ লক্ষ টাকায়।

শিলিগুড়ি রেগুলেটেড মার্কেটের পাঁচটি ব্যবসায়ী সংগঠনের যৌথ মঞ্চ রেগুলেটেড মার্কেট ট্রেডার্স ইউনাইটেড ফোরামের তথ্য বলছে, করোনার কারণে গত কয়েক মাসে তাদের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা। সংগঠনের সম্পাদক তপন সাহা বলেন, মাছ, আলু, সবজি, পেঁয়াজ, আদা, ফল সব মিলিয়ে মার্কেটে দিনে গড়ে কোটি টাকার ব্যবসা হত। সেটা এখন ৩০ লক্ষ টাকায় নেমে এসেছে। দৈনিক প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এবিসি চেম্বার অফ কমার্সের আহ্বায়ক সুরজি৻ পাল বলেন, আমাদের সমীক্ষার বাইরেও বৃহত্তর শিলিগুড়িতে অনেক ছোট ব্যবসায়ীর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যার হিসেব করলে ক্ষতির অঙ্ক আরও অনেকটাই বাড়বে। আমরা চাই, সরকার ব্যবসায়ীদের ঘুরে

দাঁড়ানোর জন্য পূর্ণ সহযোগিতা করুক। ভুটান ও উত্তর-পূর্ব ভারতের একটা বড় অংশের ব্যবসা নিয়ন্ত্রিত হয় কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ার জেলা থেকে। আলিপুরদুয়ার জেলা চেম্বার অফ কমার্সের পরিসংখ্যান অনুসারে, আন্তর্জাতিক লেনদেন বাদে জেলায় দিনে গড় ব্যবসা হয় ৫ কোটি টাকার। বর্তমানে দৈনিক ব্যবসা হচ্ছে গড়ে ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার। অর্থা৻ দৈনিক ক্ষতি ৩ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। সেই হিসাবে, গত পাঁচ মাসে জেলায় ব্যবসায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৭৫ কোটি টাকা।

জেলা চেম্বার অফ কমার্সের সম্পাদক প্রসেনজি৻ দে বলেন, ভুটানের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন ধরলে ক্ষতির পরিমাণ কয়েকগুণ বাড়বে। কোচবিহার জেলা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের তথ্য বলছে, জেলায় দিনে গড় ব্যবসা হয় ৩০ কোটি টাকার। জেলার পাট, তামাক সহ বিভিন্ন কৃষিজ ফসলের ব্যবসাই সেক্ষেত্রে প্রধান। কোভিডের জন্য বর্তমানে দৈনিক ব্যবসা কমে হয়েছে গড়ে ১৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত পাঁচ মাসে জেলায় ব্যবসার ক্ষতি হয়েছে ১৫০০ কোটি টাকারও বেশি। জেলা চেম্বার অফ কমার্সের সাধারণ সম্পাদক রাজেন্দ্রকুমার বৈদ বলেন, বেশিরভাগ ব্যবসায়ীর ঘুরে দাঁড়ানোর মতো পরিস্থিতি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

তবে উত্তর দিনাজপুর ও কালিম্পংয়ে সেভাবে কোনও পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে ব্যবসায়ী সংগঠনের কর্তাদের হিসাব বলছে, ওই দুই জেলায় গত পাঁচ মাসে ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ীদের অন্যতম সংগঠন ফোসিনের সম্পাদক বিশ্বজি৻ দাস বলেন, লকডাউন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের বিদ্যু৻ বিল মকুব সহ একাধিক দাবি ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারকে জানিয়েছি।

মালদা জেলায় গত পাঁচ মাসে ক্ষতির পরিমাণ ২৭০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মালদা মার্চেন্ট চেম্বার অফ কমার্সের দেওয়া তথ্য অনুসারে, জেলায় দিনে গড় ব্যবসা হয় ৩ কোটি টাকার। সেই ব্যবসা কমে দাঁড়িয়েছে দেড় কোটিতে। সংগঠনের সম্পাদক জয়ন্ত কুণ্ডু বলেন, মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে জুলাইয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত মালদায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার আমের ব্যবসা হয়। এবার মাত্র ৬০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে। মুর্শিদাবাদ, বিহার, ঝাড়খণ্ডের একটা অংশের সঙ্গেও আমাদের ব্যবসায়িক লেনদেন আছে। সেটাও কার্যত বন্ধ। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা চেম্বার অফ কমার্সের কর্তারা যে হিসেব দিয়েছেন তাতে জেলায় দিনে গড়ে ৩০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়। সেটা নেমে এসেছে ১৫ কোটিতে। জেলায় ক্ষতির অঙ্ক ১৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাজা বাগচি বলেন, হিলি স্থলবন্দর দিয়ে যে ব্যবসা হয় সেটা ধরলে ক্ষতির পরিমাণও বাড়বে। জেলার চাল কল, তেল মিলগুলির অবস্থা সবথেকে খারাপ।