শিলিগুড়ি শহরের দূষণের কেন্দ্র ডাম্পিং গ্রাউন্ড

78

সানি সরকার, শিলিগুড়ি :  এটাও এক পরিবর্তন। একটা সময় যা ছিল কবরস্থান, তার পরিচিতি এখন ডাম্পিং গ্রাউন্ড। একসময় যা ছিল ধু-ধু প্রান্তর। সেই জায়গা এখন জনবহুল। মাথা তুলে দাঁড়িয়ে একাধিক বহুতল। মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইছে আরও কিছু। একসময় যেখানে পাঁচ মিনিটের জন্য কেউ দাঁড়াতে চাইতেন না, এখন সেখানে জমির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। যথারীতি ল্যান্ড মাফিয়াদের নজর পড়েছে। কিন্তু এখানকার প্রায় প্রত্যেক মানুষের অভিযোগ, ডাম্পিং গ্রাউন্ডের জন্য তাঁদের এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে। অভিশপ্ত ডাম্পিং গ্রাউন্ডকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে ফি বছর আন্দোলনও সংগঠিত হয়। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার উদ্যোগ নজরে পড়ে না। বরং সামনে আসে, জেনেবুঝে বসবাস করলে তো বিষ-বাযুর শ্বাসপ্রশ্বাস নিতেই হবে।

গণকবরের জায়গা

- Advertisement -

একটা সময় যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে ওয়ান আপ টু ডাউন কথাটি বেশ প্রচলিত ছিল। কেউ কেউ আবার ওয়ান ডাউন টু আপ বলতেন। ছয়ের দশকে এমনই একটি গাড়ি ডুয়ার্সে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। একাধিক শিশু সহ প্রচুর মানুষ মারা যান সেই সময়। এত মানুষ মারা যান যে তাঁদের কবর দেওয়ার জায়গা খুঁজে পাওয়াটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রশাসনের কাছে। শিলিগুড়ি পুরসভার ফাঁকা জমিটি শেষপর্যন্ত বেছে নেওয়া হয়েছিল প্রশাসনের তরফ থেকে। যেখানে মৃতদের গণকবর দেওয়া হয়েছিল, সেই জায়গার এখন পরিচিতি ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে।

পুরসভার হাতে

তথ্য বলছে, ১৯৫২ সালে জমিটি পুরসভা কিনলেও তার অনেক আগে থেকেই এখানে মৃতদের কবর দিতেন দূরদূরান্তের বনবস্তির মানুষ। বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গল লাগোয়া জায়গাটি পুরসভা কেনার পরও তা অব্যাহত ছিল। তবে জায়গাটি নেওয়ার পর থেকেই সেখানে আবর্জনা ফেলা শুরু করে পুরসভা। তখন অবশ্য শিলিগুড়ির জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৬০ হাজারের কাছাকাছি। বাজার বলতে হাতে গোনা। ফলে সেই অর্থে আবর্জনা জমা হত না জায়গাটিতে।

বেড়েছে বসতি

নগর উন্নয়নের চাপে শহরের পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে জনসংখ্যা এবং আবর্জনার পরিমাণ। শিলিগুড়ি পুরনিগমের তথ্য বলছে, শহরে এখন বসবাসকারীর সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ এবং ২১.৪ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা ডাম্পিং গ্রাউন্ডে প্রত্যেকদিন প্রায় সাড়ে তিনশো টন আবর্জনা জমা হয়। নগরায়ণের প্রভাব পড়েছে ডাম্পিং গ্রাউন্ড সংলগ্ন ৪১ এবং  ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে। এর মূলে রয়েছে ইস্টার্ন বাইপাস। সহজ পথে জলপাইগুড়ির সঙ্গে শিলিগুড়ির সেবক রোডের সংযোগ ঘটাতে বাম জমানায় তৈরি করা হয়েছিল রাস্তাটি। উদ্যোগ নিয়েছিলেন তত্কালীন পুরমন্ত্রী এবং এসজেডিএ-র চেয়ারম্যান অশোক ভট্টাচার্য। রাস্তাটি তৈরি হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন যেমন ঘটে, তেমনই বসতি গড়ে উঠতে থাকে ডাম্পিং গ্রাউন্ড এলাকায়। একসময় হাতে গোনা বাড়ি থাকলেও এখন বাড়ির সংখ্যা গোনার সাধ্যি তেমন কারও নেই। তেমনভাবেই গড়ে উঠেছে একাধিক স্কুল এবং কলেজ।

দূষণ ছড়াচ্ছে

সময়ে সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি যেমন হয়েছে, তেমনই আবর্জনার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন ডাম্পিং গ্রাউন্ড পর্বতের আকার ধারণ করেছে। বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকাটাই কষ্টকর হয়ে উঠেছে স্থানীয়দের। ডন বসকো রোডের বাসিন্দা সুরেশ মিত্রুকা বলেন, এখানে যাঁরা বসবাস করেন, তাঁরাই একমাত্র জানেন কেমন পরিস্থিতিতে রয়েছি আমরা। এর থেকে শ্মশান ভালো। এলাকায় রোগব্যাধি বৃদ্ধির মূলেই রয়েছে ডাম্পিং গ্রাউন্ড। চৈত্র-বৈশাখ মাসের সময় প্রবল হাওয়ার সঙ্গে ডাম্পিং গ্রাউন্ডের আবর্জনা তাঁদের এলাকায় উড়ে আসে বলে জানালেন জ্যোতি পাল। পুরনিগম উদ্যোগ নেয় না বলেও তাঁর মতো অনেকের অভিযোগ। সম্রাট বসু, কালীকিংকর চট্টোপাধ্যায়ে বক্তব্য, প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে ডাম্পিং গ্রাউন্ড সমস্যার সমাধান করতে পারে পুরনিগম।

চাই নয়া প্রযুক্তি

প্রযুক্তি ব্যবহারের রাস্তায় হাঁটা শুরু হয়েছে বলে দাবি পুরনিগম কর্তাদের। কিছুদিন আগে জৈবসার তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কেএমডি-র আর্থিক সহযোগিতায় শুরু হয়েছে বায়ো মাইনিং। অর্থাৎ জৈব এবং অজৈব আবর্জনাকে আলাদা করার পাশাপাশি প্রয়োজনভিত্তিক তা মাটিতে পরিণত করা। শিলিগুড়ি পুরনিগমের প্রশাসকমণ্ডলীর সদস্য মুকুল সেনগুপ্ত বলেন, ১৮ মাসের মধ্যে ৩ লক্ষ মেট্রিক টন আবর্জনাকে নষ্ট করে দেওয়া হবে। যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হওয়ার পর জায়গাটি পুনরায় ফাঁকা জায়গা হিসেবে চিহ্নিত হবে।