ফাইল ছবি

শান্ত বর্মন ও নীহাররঞ্জন ঘোষ, জটেশ্বর ও মাদারিহাট : প্রায় তিনশো বছর আগে ডুয়ার্সের জলদাপাড়া জঙ্গল ঘেঁষা খাউচাঁদপাড়া এলাকায় সর্বপ্রথম দুর্গাপুজোর সূচনা করেছিলেন ওই এলাকার জমিদার তথা দেওয়ান খাউচাঁদ কার্জি। রাজ আমলে শুরু হওয়া সেই পুজো আজও সাড়ম্বরেই করা হয় ফালাকাটা ব্লকের জলদাপাড়া জঙ্গল লাগোয়া খাউচাঁদপাড়া এলাকায়। তবে সেই পুজো এখন আর পারিবারিক নয়, তা সর্বজনীন। খাউচাঁদপাড়ার এই পুজো বাবুরহাটের পুজো নামেই পরিচিত। জলদাপাড়া জঙ্গল লাগোয়া এই এলাকায় মিশ্র জনজাতির বাস হলেও সবাই নিজের নিজের রীতিতেই দেবী দশভূজাকে পুজো দেন।  পুরোনো তথ্য এবং খাউচাঁদ কার্জির পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় তিনশো বছর আগে জলদাপাড়া সংলগ্ন জঙ্গলঘেরা এলাকায় বসতি স্থাপন করেন খাউচাঁদ কার্জি। সেই সময় একদিকে ছিল বন্যজন্তুর হামলা, অন্যদিকে ভুটানরাজ ও ব্রিটিশদের আক্রমণ। এলাকাবাসীর দাবি, বন্যজন্তু কিংবা শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা পেতেই খাউচাঁদ জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। খাউচাঁদ কার্জির পর সেই পুজোর দায়িত্ব নেন তাঁর এক ছেলে ধনীরাম কার্জি। তিনিও আজীবন দুর্গাপুজো করে গিয়েছেন। তারপর পুজোর দাযিত্ব নেন ধনীরামবাবুর একমাত্র পুত্র ললিত কার্জি। তিনি কয়েকবার পুজো করার পর দায়িত্ব নেন সেই পরিবারের সঙ্গে জড়িত খগেন্দ্রনাথ বর্মন। দুর্গাপুজোর জন্য আলাদাভাবে জমিও দান করেন খগেনবাবু। তিনি মারা য়াওয়ার পর সর্বজনীন হযে যাওয়া পুজোর দাযিত্ব নেয় এলাকার পুজো কমিটি। বর্তমানে পুজো কমিটিই সেই রাজ আমলের পুজো পরিচালনা করছেন।

তবে রাজ আমলের সেই পুজো সর্বজনীন কমিটির হাতে তুলে দেওয়ার পরেও কেটে গিয়েছে দীর্ঘ ৫৭ বছর। এবারে সেই সর্বজনীন পুজো ৫৮ তম বর্ষে পদার্পণ করবে। কমিটি গঠন করে স্থানীয়রাই এই পুজো পরিচালনা করছেন। কমিটির তরফে নামকরণ হয়েছে প্রতিবাদ সংঘ। বর্তমানে প্রায় ৭০ জন সদস্য মিলে এই রাজ আমলের পুজো পরিচালনা করছেন।

খাউচাঁদ কার্জির পরিবারের উত্তরসূরি রঞ্জিত কার্জি, চম্পা কার্জি বলেন, আমাদের তিন পুরুষ আগে খাউচাঁদ কার্জি এই এলাকায় দুর্গাপুজো সহ আরও একাধিক পুজোর সূচনা করেছিলেন। সেই সময়ে এই এলাকার জমিদার ছিলেন তিনি। আমাদের পরিবারের সঙ্গে কোচবিহার এবং অসমের গৌরীপুরের রাজ পরিবারের যোগাযোগ ছিল। পুজো সহ নানা সময়ে দুই অঞ্চলের রাজারা আমাদের বাড়িতে আসতেন। বেশ কয়েকদিন কাটাতেন এই এলাকায়। তারও অনেক পরে হাতি কিনতেও এই এলাকায় এসেছিলেন কোচবিহারের শেষ রাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ।

রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালযে ডিন অধ্যাপক দীপককুমার রায় বলেন, কোচবিহারের রাজকন্যা সুনীতি দেবীর লেখা শিকার কাহিনিতে উল্লেখ আছে, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার পরেই লর্ড কার্জন নৃপেন্দ্র নারায়ণকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকটি জায়গায় শিকার করতে গিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি হল শালকুমার এলাকা। ওইসময় গৌরীপুরের রাজা প্রভাতচন্দ্র বড়ুয়া সহ অনেকেই হাতি বশ করার জন্য অন্তত দশবার শালকুমার অঞ্চলে আসেন।

বর্তমান পুজো কমিটির সভাপতি ইন্দ্রজিত্ দাস বলেন, ৫৮ বছর ধরে এই এলাকার সবচেয়ে পুরোনো এই পুজো হচ্ছে। এখানে এলাকার বহু মানুষ ভিড় করেন। আমরা এই পুজোকে দীর্ঘস্থাযী করতে চাই। এবারের পুজোয় সমাজ সচেতনতামূলক বিষয় তুলে ধরা হবে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বন্যপ্রাণ রক্ষার বিষয়টি নিযে সরব আছি। সেটা এই পুজোতেও থাকবে।