দুর্গাপুজোয় পর্দানসীন থাকেন এই জমিদার বাড়ির মহিলারা

220

বর্ধমান: শারদোৎসবে সর্ব শক্তিরূপেণ দেবী রূপেই পূজিত হন দুর্গা। সর্বশক্তিমান এই নারীরূপের পুজো ঘিরে আপামোর বাঙালির ভক্তিভাবের কোনও খামতি থাকে না। তবুও দুর্গাপুজোয় পর্দানসীন থাকতে হয় পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের চকদিঘির সিংহরায় জমিদার বাড়ির মহিলাদের। একদা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাহচর্য্য পাওয়া এই জমিদার পরিবারে মহিলাদের আজও শুধুমাত্র আভিজাত্য বজায় রাখতেই এমন ভবিতব্য মেনে নিয়েই চলতে হচ্ছে।

বৈদিক মতে সিংহরায় জমিদার বড়ির দুর্গাপুজোর আরাধনা হয়। একচালার কাঠামোয় ডাকের সাজে প্রতিমা সাজানো হয়। দেবী মূর্তির দু’পাশে বসানো থাকে জয়া ও বীজয়া নামে দুই পরীর মূর্তি। মন্দির চত্বর সাজানো হয় এক ভিন্ন আঙ্গিকে। একটি গোটা নারকেল, আমের পল্লব ও একটি কাঁঠালি কলা একসঙ্গে নিয়ে বাঁধা থাকে মন্দির চত্বরের প্রতিটি থামে। প্রতিপদের দিন থেকে শুরু হয় পুজো। পঞ্জিকার নির্ঘণ্ট মেনে পুজো করেন হুগলির লোকনাথ এলাকার নিবসী কুলো পুরোহিত ভোলানাথ চতুর্বেদী। পুজোয় কাজু, কিসমিস, পেস্তা, আখরোট ও মেওয়া ফল চাই। নৈবেদ্য সাজানো হয় চিনির সন্দেশ, ছোট ও বড় মুণ্ডি, ডোনা, নবাত, রশকরা, মুড়কি প্রভৃতি দিয়ে। পারিবারিক নিয়ম মেনে স্থলপদ্মে হয় দেবীর পুজো। একমাত্র সন্ধিপুজোয় লাগে ১০৮টি জলপদ্ম। সন্ধিপুজোর সময় দুটি মন্দিরের দেবী প্রতিমার সামনে ব্রাহ্মণ পরিবারের বিধবা মহিলাকে দিয়ে ধুনো পোড়ানো হয়। পুজোর প্রতিটি দিন দেবীর কাছে নিবেদন করা হয় হরেক রকম নিরামিষ ভোগ। মহাষ্টমীর দিন থেকে পুজোর নৈবেদ্যে দেওয়া হয় মাখা সন্দেশ। প্রথা থাকলেও বেশ কয়েক বছর হল ছাগবলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তে এখন সন্দেশ নিবেদন করা হয়। নবমীর দিন একই সময়ে চকদিঘি ও মণিরামবাটির মন্দিরে কুমারী পুজো অনুষ্ঠিত হয়। জমিদার বাড়ির পুজোর জোগাড়ে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ। সবকিছুই করেন জমিদার বংশের পুরুষরা। সবথেকে আশ্চর্য্যের বিষয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের যাতায়াত যে বাড়িতে ছিল সেই সিংহরায় পরিবারের মহিলারা এখনও পুজোয় পর্দানসীন থাকেন।

- Advertisement -

জমিদার পরিবারের বর্তমান বংশধর অম্বরীশ সিংহরায় জানিয়েছেন, অন্দর মহল থেকে পরিবারের মহিলারা মন্দিরে পুজো দিতে কিংবা ঠাকুর দেখতে আসার সময় তাঁদের পথের দু’পাশ আড়াল করার জন্য কাপড় দিয়ে ‘কানাত’ টাঙানো হয়। এর কারণ প্রসঙ্গে অম্বরীশবাবু বলেন, ‘পারিবারিক প্রথা মেনে পুজোর সময় আমাদের বাড়ির বউরা পর্দার পিছনে থাকেন। বংশ পরম্পরায় এই ঐতিহ্য মেনে আসা হচ্ছে। জমিদার বাড়ির বউদের মুখ অন্য কেউ যাতে দেখতে না পান তাই এই ব্যবস্থা তৈরি রাখা থাকে। আগে পুজোয় বাগানবাটিতে হতো যাত্রাপালা। এখন সেসব পাঠ উঠে গিয়েছে। প্রথা মেনে একাদশীতে কাঙ্গালী বিদায় পর্ব শেষে পুজোর সমাপ্তি ঘটে জমিদার বাড়িতে।’