বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : দুই আঙুলের ইশারায় গোল গোল কিছু একটা দেখাল রুবেল। ওর পাশেই দাঁড়িয়েছিল সীমান্ত। কী যেন ঠিক বুঝল! আর সঙ্গে সঙ্গে হাত দুটি নাচের মুদ্রার মতো ভঙ্গিতে আনতেই সেকি উচ্ছ্বাস প্রত্যেকের। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে হাসিতে কুটিপাটি। কিন্তু মুখে একটিও শব্দ নেই কারোর। কী বলছে ওরা? প্রশ্ন শুনে শিক্ষক জানালেন, ওরা বলছে, মা আসছে। দুর্গাপুজোয় বেড়াতে যাবে। ওদের নতুন জামা হবে। মোট কথা নিঃশব্দের ভুবনেও এক অদ্ভুত খুশির আবহ। সীমান্ত, রুবেলরা আদতে মূক-বধির। শব্দময় পৃথিবীটা ওদের কাছে বড্ড অচেনা। শোনা বা বলার পাঠ পড়েনি কেউই। যত ভাব, যত কথা সবকিছুর আদান-প্রদানই ইশারায়, হাত ও আঙুলের মুদ্রায়। যার পোশাকি নাম সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ। তাদের সেই নীরব ভাষাতেই ধরা দিয়ে যায দুঃখ, যন্ত্রণা, আশা এমনকি আগমনি বার্তাও।

ভিড়ের মাঝেও এই নিঃশব্দের জগতে মাথা তুলে বেঁচে থাকার অদম্য জেদ মরে না কখনোই। দয়াদাক্ষিণ্য নয়, ওরা অধিকার বুঝে নিতে শিখেছে শিক্ষার অঙ্গন থেকে খেলার সবুজ মাঠ অথবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চেও। লড়াই অসম। প্রতিবন্ধকতা পদে পদে। অথচ চমকের শেষ নেই। অনুভবের পরতে পরতে মিশে শুধুই বিস্ময়। শরতের আকাশে মেঘের ভেলা ভাবতেই ওদের মুখে হাসি। নতুন কিছুর ভাবনা ছুঁয়ে যায় চোখের কোণে। ছোট্ট সীমা কোনো ফাঁকে খাতা, পেনসিল নিয়ে মেঝেতে বসে যায়। আনমনেই আঁকিবুকি কাটে। একটু পরেই সাদা পাতায় আঁকা ছবি নিয়ে হাজির সামনে। দুই হাত উঁচু করে দাঁড়ায়। শিক্ষক হাসেন। বলেন, ও বলছে, দেখো মা দুর্গার ছবি এঁকেছি। শিশুর কল্পনায় এখানে দেবী উমা ঠিক ওদেরই মতো। অলংকারে সজ্জিত নয়, অতি সাধারণ মেয়ে। কে বলতে পারে, হয়তো নিজের মায়ের মুখ কল্পনা করেই সীমা ছবি এঁকেছে কিনা!

উত্তর দিনাজপুরের কর্ণজোড়ায় সূর্যোদয় আবাসিক হোমে পা রাখলেই ওদের দেখা মিলবে। সংখ্যায় ৬৫। তাদের মধ্যে ৫৩ জন কিশোর, বাকিরা কিশোরী। এই ছেলেমেয়েদেরও মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন আছেন হয়তো। কিন্তু ওদের কথা কেউ জানে না। বলতেও পারে না তাদের কথা। বাড়ির কেউ খোঁজও নিতে আসেন না ওদের। তাই সব থেকেও কিছুই নেই বাচ্চাগুলির। অসহায় জীবনে হোমের কর্মীরাই আশা ও ভরসা হয়ে উঠেছেন। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের বাসিন্দা এই কিশোর-কিশোরীরা। শারীরিক এবং মানসিক বিশেষভাবে সক্ষম বলে পালটেছে ঠিকানা। হারিয়েছে নিজেদের বাড়ি। সারাদিন হোমের চার দেওয়ালে সময় কাটে ঠিকই, তবু ওদেরও মন ছুঁয়ে যায় শরতের স্নিগ্ধতা। একঘেয়ে জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফেরে। নতুন কিছু দেখার, অনুভবের আশা জাগে। অন্তত কাকুদের হাত ধরে ঘরের বাইরে পা রাখা তো হবে! গোল্লাছুট খেলায় মগ্ন রুবেল ও সীমান্ত আঙুল দিয়ে কাটাকুটি দেখায। শিক্ষক জানিযে দেন, ওরা বলছে নতুন জামা পরবে। বেড়াতে যাবে। কে বলে কোলাহলহীন জীবন উৎসবের সুবাসে মোহিত হয় না?

মা আসার আনন্দেই এখন মোহিত রূপা, প্রতিমা, বাউলরা। নিজেরা কথা বলতে অক্ষম। আসল নাম কী, সেটাও জানে না। উদ্ধারের পর হোম কর্তৃপক্ষই প্রত্যেকের নামকরণ করেছে। এখন সকলে সেই নামেই পরিচিত। কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে মিলেছে পান্থ পদবী। সেটাই এই হোমের আবাসিকদের পরিচয়। হোমের নথিতে কে কোন এলাকা থেকে উদ্ধার হয়েছে সেই ঠিকানাও লেখা রয়েছে। হাতের ইশারার নাম জানতে চাইলে সকলেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ঠিক পরের মুহূর্তেই হাত নাড়িয়ে কথা বলতে শুরু করে ওদের নিজস্ব ভাষায়। হোমে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে এদের কারোর বাবা-মা কখনো খোঁজ নিতে আসেনি। তবে সেসব ভুলিয়ে রাখেন হোমের কর্মী ও কর্তারা।

বিশেষ পদ্ধতিতে লেখাপড়ার পাশাপাশি চলে নাচ, নাটক, হাতের কাজের চর্চা। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে এই সরকারি হোম। ছেলে ও মেয়েদের পৃথক আবাসন। থাকা ও খাওয়ার জন্যও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। কিশোর-কিশোরীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে প্রত্যেকের জন্য রয়েছে হাতের কাজের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। বেশ কয়েকবার মূকাভিনয় ও মঞ্চে নাটক পরিবেশন করে ওরা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, কোনো কিছুতেই পিছিয়ে নেই আমরা। তাদের অভিনয়ে নাট্যপ্রেমীরা মুগ্ধ হয়েছেন। যদিও দর্শকদের বাহবা-উচ্ছ্বাসের কিছুই অনুভবে আসেনি রুবেল-সীমান্তদের।

হোম সূত্রে জানা গিয়েছে, বছরভর হোমে থাকলেও পুজোর দিনগুলিতে শহরের মণ্ডপে নিয়ে প্রতিমা দর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়াও শারদ উৎসবের দিনগুলোতে থাকে বিশেষ খাওয়ার আয়োজন। তাই ঠিক সময়ে ওরা পুজোর গন্ধ অনুভব করে ফেলে। হোমের কর্মীরা জানিয়েছেন, এই ছেলেমেয়েগুলি মূকবধির হলেও, সংবেদনশীল এবং স্পর্শকাতর। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখেই বুঝতে পারে কে কী চাইছে। আর খুবই অভিমানী ওরা। কেউ দয়াদাক্ষিণ্য দেখাক ওরা সেটা চায় না। আর শেষ নেই জানার ইচ্ছের। নিজেদের মধ্যে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে আলোচনা সেরে নেয় যা সাধারণের কাছে দুর্বোধ্য। ওদের খুশি, উচ্ছ্বাসের সেসব কিছুই আমাদের খালি চোখে ধরা পড়ে না। সে এক অন্য ভুবন।