রীতির বিপরীতে গণেশ-কার্তিককে অধিষ্ঠিত রেখে পুজো হয় সভাকর বাড়িতে

138

বর্ধমান: পুরোহিত সঠিকভাবে পুজো করাচ্ছিলেন। কিন্তু আকন্ঠ কারণ সুধা পান করে পুজো করতে বসে পূর্বপুরুষ বলে যাচ্ছিলেন বামে গণেশায় নমঃ, দক্ষিণে কার্তিকেয় নমঃ। পুরোহিত প্রতিবাদ করলেও বাস্তবে দুর্গা প্রতিমায় গণেশ ও কার্তিকের এমন স্থানবদল সবাইকে চাক্ষুষ করিয়েছিলেন ওই তন্ত্রসাধক পূর্বপুরুষ। সেই থেকে ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বামে গণেশ ও ডানদিকে কার্তিককে রেখে পূর্ব বর্ধমানের জামলপুরের সাদিপুর গ্রামের সভাকর বাড়িতে তৈরি হয় দুর্গা প্রতিমা। দেবী পক্ষে তন্ত্রমতে হয় সেই প্রতিমারই পুজো পাঠ। সভাকর বাড়ির এই পুজো ঘিরে মেতে ওঠেন গ্রামের বাসিন্দারা।

দামোদর লাগোয়া জামালপুরের বেরুগ্রাম পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত গ্রাম সাদিপুর। সনাতন ঐতিহ্য মেনে এই গ্রামের সভাকর বাড়ির সাবেকি মন্দিরে হয় দেবীর আরাধনা। সভাকর পরিবারের বর্তমান বংশধর দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষ বল্লাল সেন, লক্ষণ সেনের আমলের লোক। বর্গিদের অত্যাচারে নিজ ভূমি ছেড়ে পূর্বপুরুষরা চলে আসেন সাদিপুর গ্রামে। সেখানেই তারা বসবাস শুরু করেন। দেবাশিসবাবু আরও জানান, তাঁদের বংশের আদি অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন কালী। বংশে কালিপুজোর সূচনাকাল বহু প্রাচীন। তবুও মা দুর্গার স্বপ্নাদেশ মেনে তাঁদের বংশের পূর্বপুরুষ উমাচরণ চট্টোপাধ্যায় কালী বেদিতেই দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন। দরিদ্র সাধক উমাচরণ চট্টোপাধ্যায় পুকুরের জল, বনের ফুল, চালতার আচার আর থোড়ের নৈবেদ্য দিয়ে দেবী দুর্গার পুজো করতেন। সেই রীতি মেনে বাংলার ১,১১১ সাল থেকে আজও একই ধারায় পুজো হয়ে আসছে।

- Advertisement -

সভাকর বাড়ির দুর্গাপুজোর অনেক কাহিনী আজও বংশের লোকজনের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়। কথিত আছে, বহুকাল পূর্বে বন্যার সময়ে দামোদরে পাটাতন সহ দুর্গা প্রতিমার একটি কাঠামো ভেসে আসে। স্থানীয় নাগড়া গ্রামের বর্গক্ষত্রিয় ধারা পরিবারের কয়েজন সদস্য দামোদর থেকে সেই কাঠামোটি তুলে আনেন। সেই কাঠামোটি দেবীপুরে বিক্রি করতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মা দুর্গার স্বপ্নাদেশ মেনে তাঁরা ওই কাঠামো আর দেবীপুরে বিক্রি করতে না গিয়ে দেবীর নির্দেশ মনে পাটাতন সহ ওই কাঠামোটি দরিদ্র সভাকর পরিবারের বিধবা বধূ রতনমণি দেবীকে দিয়ে দেন। সেই পাটাতন ও প্রতিমা তৈরির কাঠামোতেই আজও দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে সভাকর বাড়িতে পুজো হয়ে আসছে। সেই সময়কাল থেকে প্রতিবছর দুর্গা পুজোর সময়ে নাগড়ার বর্গক্ষত্রীয় ওই ধারা পরিবারে নৈবেদ্য পাঠান সভাকর পরিবারের সদস্যরা। এছাড়াও পূর্বপুরুষ উমাচরণবাবুর সময়কালে একদল ডাকাত এক রাতের মধ্যে কাঁচা মাটির দেওয়াল ও খড়ের চালার মন্দির তৈরি করে দিয়েছিলেন। সেই সময়কার কাঁচা মাটির দেওয়াল ও খড়ের চালার মন্দিরটি আর এখন নেই। সভাকর বংশের বংশধররা পরবর্তীকালে ওই একই জায়গায় একটি সুন্দর পাকা দালান মন্দির তৈরি করেন।

পুজোর সূচনার ইতিহাস যেমন বৈচিত্রে ভরা তেমনি বৈচিত্র রয়েছে সভাকর বাড়ির দুর্গা প্রতিমায়। সাবেকি আমলের একচালার কাঠামোয় দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করা হয়। তবে এই সভাকর বাড়িতে দুর্গা প্রতিমায় সাধারণ রীতির ঠিক বিপরীত অবস্থান দেখা যায় গণেশ ও কার্তিকের। এই বাড়ির প্রতিমায় গণেশ দেবী দুর্গার বামদিকে অবস্থান করেন। আর কার্তিক বামদিকের পরিবর্তে ডানদিকে অবস্থান করেন। তবে কলা বউকে দুর্গা প্রতিমার ডানদিকে অর্থাৎ কার্তিকের পাশে রেখেই পুজো হয়। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর অবস্থানে অবশ্য কোনও পরিবর্তন নেই। এই বাড়ির প্রতিমায় দুর্গার বাহন সিংহ সাদা বর্ণের। তার মুখটি আবার ঘোড়ার মুখের ন্যায়। রায়নার মহেশ পালের পরিবার পুরুষানুক্রমে সভাকর বাড়ির এমন ব্যতিক্রমী মূর্তি তৈরি করে আসছেন। সভাকর বাড়ির গৃহকর্ত্রী মানসী চট্টোপাধায় জানান, প্রতিপদের দিন থেকে চণ্ডীপাঠ, আরতি ও ভোগ বিতরণের মধ্য দিয়ে বোধন হয়ে যায়। তন্ত্র মতে মায়ের পুজো হয়। পুরোহিত মাণিক মুখোপাধ্যায় জানান, পূর্বে বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলা মন্দিরে কামান দাগার শব্দ শুনতে পাওয়ার পর সভাকর বাড়িতে বলিদান শুরু হত। সেইসব এখন ইতিহাস। বর্তমানে পঞ্জিকার সময় অনুযায়ী বলিদান হয়। দশমীর দিন দধিকর্মা ও সিঁদুর খেলা পর্ব মিটে যাওয়ার পর রাতে শোভাযাত্রা করে দুর্গা প্রতিমা দামোদরে গিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। থিম ভাবনা ও আলোক রোশনাইয়ের ঘনঘটা না থাকলেও ভক্তিভাব ও নিজস্ব স্বকীয়তাতেই সভাকর বাড়ির দুর্গাপুজো মাধুর্য বহন করে চলেছে।