দুর্গাপুজোয় বরাত না মিললেও আয়ের আশায় মহড়াতে ব্যস্ত ঢাক শিল্পীরা

406

পঙ্কজ ঘোষ, গাজোল: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। তার মধ্যে অন্যতম উৎসব বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। সারা বছরই নানারকম উৎসব হয়ে থাকে। কিন্তু দুর্গাপুজোয় বাঙালিরা অফুরন্ত আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন। দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে বরাত মেলেনি ঢাকিদের। চিন্তায় আছেন তাঁরা। তবুও মনোবল ভাঙেনি। দুর্গাপুজোর জন্য বাদ্যযন্ত্রকে একটু ঝালিয়ে নিচ্ছেন তাঁরা। ঢাক নিয়ে মহড়াতে ব্যস্ত গাজোলের ঢাক শিল্পীরা।

মহালায়া পার হলেও এখনও ঢাকিদের বায়না পড়েনি বললেই চলে। করোনা আবহে পুজোর বরাত না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন গাজোলের ঢাকিরা। গাজোলে বিভিন্ন গ্রাম অঞ্চল সহ প্রায় সবমিলিয়ে শতাধিক ঢাকি রয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবছরও দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে ঢাক বাজানোর জন্য বায়না পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা। কিন্তু মহালয়া পার হলেও কোনও ক্লাব ও বারোয়ারি এবং পারিবারিক দুর্গাপুজোর জন্য এখনও বায়না হয়নি। দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তাঁরা। পারিবারিক পুজোর এখনও কোনও বায়না হয়নি। মার্চের শেষ সপ্তাহের পর লকডাউন ঘোষণা, তারপর থেকেই এলাকাবাসী গৃহবন্দী। পুজো উৎসব অনুষ্ঠান সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল করোনা প্রকপের জন্য। তারপর থেকে কোনও পুজোতেই ডাক আসেনি। মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহের বাসন্তী পুজো হয়েছিল গাজোলের বাসন্তীতলা এলাকায়। প্রতিমা না উঠিয়ে পুজো করা হয়েছিল। করোনা প্রকপের জন্য তারপর থেকে পুজোর আঙিনায় ঢাকের আওয়াজ কানে আসত না বললেই চলে। মার্চ মাসের পর থেকে কোনও পুজোতে ঢাক বাজাতে যেতে পারেননি গাজোলের অনেক ঢাকি। বাঙালির অন্যতম পুজো দুর্গাপুজো। অন্যান্য পুজো থেকে দুর্গাপুজোয় অনেকটাই আনন্দ বেশি হয়। পুজো উপলক্ষ্যে অনেকেই নতুন জামাকাপড় কেনেন কিন্তু গাজোলের ঢাকিদের অবস্থা অনেকটাই আলাদা। তারা হয়তো ছেলেমেয়েদের জন্য জামাকাপড় কিনতে পারবেন কিনা তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন।

- Advertisement -

হাতে গোনা আর কয়েকদিন বাকি বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোর। দেওতলার ঢাকি বাদক প্রদীপ ভুইমালি বলেন, ‘৪০ বছর ধরে তিনি ঢাক বাজিয়ে আসছেন। এই ধরনের পরিস্থিতিতে তিনি কোনওদিনও পড়েননি। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির জন্য মার্চ মাসের পর থেকে ঢাক বাজানো প্রায়ই বন্ধ হয়ে গিয়েছে বললেই চলে। মহালায়া হয়ে গিয়েছে, পুজো আসছে আর কিছুদিন বাকি। কিন্তু এখনও কোনও পুজো মণ্ডপ বা ক্লাব থেকে দুর্গাপুজোর জন্য ঢাক বাজানোর জন্য কোনও বায়না আসেনি। খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছি। বিগত কয়েক মাস দিনমজুর সহ অন্যান্য কাজ করে কোনওরকমে ডালভাত খেয়ে সপরিবারে বেঁচে রয়েছি। ঢাক বাজানো আমাদের পেশা। পেশাগত ব্যবসা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত হয়ে গিয়েছি। বাড়িতে ছোটখাটো পুজো হলেও ঢাক বাজানোর জন্য আমাদের বায়না করত। ঢাক বাজানোর জন্য ডাক আসত। কিন্তু করোনা আবহে বাড়িতে ঢাক বাজানোর জন্য কেউ এখনও পর্যন্ত ডাকেননি। পুজো আসছে সংসার কোনরকমে চললেও পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন জামাকাপড় কেনার চিন্তাভাবনা মাথায় আনতে পারছি না। কোনও বছর এরকম পরিস্থিতিতে পরিনি। এই প্রথম মহামারি করোনা ভাইরাসের জন্য দুর্দশার শিকার হয়েছি আমরা। জানি না এ বছর দুর্গাপুজায় ঢাক বাজাতে পারব কিনা। তাই বাদ্যযন্ত্রগুলিকে একটু ঝালিয়ে নিচ্ছি। শুধু এখন দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে ঢাক বাজানোর বায়না পাওয়ার অপেক্ষায়।’

গাজোলের কদুবাড়ি এলাকার ঢাক বাদক সুবোধ মৃধা জানান, তিনি বিগত ১৮ বছর ধরে ঢাক বাজিয়ে আসছেন। কোনওদিনও সমস্যায় পড়েননি। কিন্তু বিগত বিগত ছয় মাস ধরে খুব সমস্যায় আছেন। তাঁরা বিয়ে বাড়িতে বাজনা বাজাতে যেতে পারছেন না এবং কোনও পুজোতে তেমনভাবে ডাক আসছে না বললেই চলে। পুজোর অনেক আগে থেকেই পুজোতে ঢাক বাজানোর জন্য বায়না হয়ে যায়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো বায়না পায়নি। বাদ্যযন্ত্রগুলিকে একটু ঝালিয়ে রাখছি। শুধু অপেক্ষায় রয়েছি পুজো উদ্যোক্তারা কবে বায়না করবে। একই ধরনের সমস্যার কথা জানান গাজোলের তুরি পাড়া এলাকার সজল ভুইমালি। তিনিও বিগত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে ঢাক বাজিয়ে আসছেন এরকম ভয়ানক পরিস্থিতিতে কোনদিনও পড়েননি তাঁরা। গাজোলের এই ঢাকিদের মতো অনেকেই রয়েছেন যাঁরা এখনও দুর্গাপুজোর বায়না পাননি। এখন শুধু অপেক্ষায় দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে ক্লাব উদ্যোক্তারা কবে বায়না করবেন। তবে হয়তো একটু হলেও মুখে হাসি ফুটতে পারে।