স্বপ্নে পাওয়া কাঠামোয় রতুয়ায় দেবীর পুজো শুরু করেন মুসলিম জমিদার

276

শেখ পান্না, রতুয়া: তখন দেশে ইংরেজ শাসন। রতুয়ায় কালিন্দ্রীর ধারে জমিদারি পত্তন করেছিলেন এক মুসলিম জমিদার। নাম জহুর খান। আদতে বর্তমান মানিকচকের নুরপুরের বাসিন্দা। কিন্তু জমিদারি চালাতেন রতুয়া থেকেই। ৩২৮ বছর আগে দেবীর স্বপ্নাদেশে দুর্গাপুজোর প্রবর্তন করেন তিনি। ভিন্ন ধর্ম, পুজোর রীতি কিছুই জানেন না। স্বপ্নে দেবীকে সেসব জানালেও মা তাঁকে নাকি নির্দেশ দেন, তিনি সব ধর্মের মানুষেরই মা। সবাই তাঁর সন্তান। তাই তিনি জমিদারের হাতেই প্রতিষ্ঠিত হবেন। তাঁর কাঠামো জমিদারির কাছারি বাড়ির সামনে কালিন্দ্রীর ঘাটে চলে এসেছে। সঙ্গে রয়েছে পুজোর বিভিন্ন সামগ্রীও। পরদিন ভোরে জহুর খান যেন সেসব নদী থেকে তুলে এনে তাঁকে স্থাপন করেন। ঘুম ভেঙে যায় জমিদারের। কথিত আছে পূব আকাশ ফর্সা হতেই তিনি দৌড়ে যান কাছারি বাড়ির সামনের নদীঘাটে। দেখেন, মায়ের স্বপ্নাদেশ মিলিয়ে সব কিছু ঘাটে ঠেকে রয়েছে। লোকজন নিয়ে জমিদার সেসব তুলে আনেন নদী থেকে। নিজেই শুরু করেন দুর্গাপুজো। তবে কয়েক বছর পর পুজোর দায়িত্ব তুলে দেন এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের হাতে। এখনও পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলছে পুজো। একই পদ্ধতি ও রীতি মেনে।

রতুয়ার মাড়োয়ারি পট্টি। সামনে দিয়ে বইছে কালিন্দ্রী। খানিকটা দূরে ফুলহর। সেখান থেকেই এই নদীর সৃষ্টি। ৫০ বছর আগেও খরস্রোতা ছিল কালিন্দ্রী। তবে ভাঙন রুখতে ফুলহর-কালিন্দ্রীর সঙ্গমে বাঁধ তৈরি করেছে সেচ দপ্তর। এখন সারা বছর কালিন্দ্রীতে তেমন জল থাকে না। তবে বর্ষায় প্রায় প্রতি বছর ফুলহরের বাঁধভাঙা জল তার শাখা নদীতে চলে আসে।

- Advertisement -

স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, পূর্ণগর্ভা কালিন্দ্রী দিয়ে একটা সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় বড় নৌকা, পণ্যবোঝাই জাহাজ এসে ঠেকত কালিন্দ্রীর ঘাটে। বাণিজ্যকে পাখির চোখ করেই মাড়োয়ারি পট্টিতে কাছারি ঘর তৈরি করেন জহুর খান। সেই বাড়ি অবশ্য এখন আর নেই। কালের গর্ভে কবেই চলে গিয়েছে। তবে এখনও তাঁর জমিদারির কিছু নিদর্শন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তাঁর দান করা দুই একর জমির উপরেই পরবর্তীতে তৈরি হয়েছে দুর্গামন্দির। এই পুজো এখন রতুয়া বারোয়ারি দুর্গাপুজো হিসাবেই এলাকায় পরিচিত।

পুজো কমিটির সদস্য অশোক আগরওয়াল জানাচ্ছেন, এবার এই পুজো ৩২৮ বছরে পা দিচ্ছে। জহুর খানের দান করা দুই একর জমিতে মায়ের মন্দির তৈরি হয়েছে। সেই মন্দিরের বয়সও ১০০ বছর হয়ে গেল। স্বপ্নাদেশ পেয়ে জমিদার কালিন্দ্রী থেকে যে কাঠামো তুলে নিয়ে এসেছিলেন, সেই কাঠামোয় এখনও মায়ের মূর্তি তৈরি হয়। প্রথম দিন থেকে এখনও পর্যন্ত পুজোর রীতিতে কোনও পরিবর্তন হয়নি। এই পুজোয় প্রথম থেকেই বলিপ্রথা চালু রয়েছে। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিথিতে ছাগবলি হয়। নবমী তিথিতে আড়াইশোর ওপর বলি হয়। পুজোকে কেন্দ্র করে মন্দির চত্বরে মেলার আয়োজন করা হয়। করোনার জন্য দু’বছর ধরে মেলা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে পুজোয় নরনারায়ণ সেবায় কোনও ছেদ পড়েনি। শুধু ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচতে এখন আর কাউকে বসে খাওয়ানো হচ্ছে না। প্লেটে ভোগ বিলি করা হচ্ছে।