করোনা আতিমারির জেরে দুর্গা বন্দনায় কড়াকড়ি বর্ধমানে

254

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: করোনা অতিমারির মধ্যেই এবছর দুর্গোৎসবের ঢাকে কাঠি পড়েছে। আজ মহাষষ্ঠী। হাইকোর্টের নির্দেশকে মান্যতা দিয়েই পূর্ব বর্ধমানের পুজো উদ্যোক্তারা পুজোর আয়োজন করেছেন। শহর বর্ধমান হোক কিংবা মফস্বল এলাকা সর্বত্রই প্রতিমা দর্শন থেকে শুরু করে পুজো মণ্ডপে প্রবেশ নিয়ে বিধিনিষেধ বলবৎ করা হয়েছে। মাস্ক পরিহিত হয়ে থাকলে এবছর দুর্গোৎসবের দিনগুলিতে মিলবে ঘোরা ফেরার ছাড়। এইসব কিছু মানতে গিয়ে পুজো আয়োজক থেকে শুরু করে দর্শনার্থী সকলেই দিশেহারা। তবুও বাঙালির উচ্ছাসের অন্ত নেই।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় কয়েকদিন আগে পূর্ব বর্ধমানের সাতটি নামি পুজোর ভার্চুয়াল উদ্বোধন করেন। বর্ধমান শহরের বড়নীলপুর মোড়ের লাল্টু স্মৃতি সংঘ, ছিন্নমস্তা মন্দিরের পাশে সবুজ সংঘের পুজোর উদ্ধোধনও করা হয়। ওই দিন শহরে পুজোর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জেলাশাসক বিজয় ভারতী ও পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় সহ জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

- Advertisement -

একই দিনে মেমারির সারদাপল্লী অরবিন্দপল্লী পুজো কমিটির পুজো, বড়শুলের জাগরনী ক্লাবের পুজো, কালনার মহকুমার পুরাতন বাসস্ট্যাণ্ড বারোয়াড়ি ব্যবসায়ী সমিতির পুজো ও নসরতপুর ইন্দ্রপল্লী বারোয়াড়ি পুজো ও কাটোয়ার নবদয় সর্বজনীন পুজোর উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রশাসনিক নিয়ম মানার পাশাপাশি স্বাস্থবিধি মেনে পুজোর যাবতীয় আয়োজনের বার্তা দেন জেলা প্রসাসনিক কর্তারা।

এদিকে পুজো আয়োজক কর্তাদের রাত জেগে মণ্ডপ পাহারা দেওয়ার ফরমান জারি করছে জেলা পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায়। একই সঙ্গে তিনি জানান, কিছু কুচক্রী সক্রিয় রয়েছে। তাই সকলকে সাবধানে থাকতে হবে, যাতে করে সম্প্রীতির বাতাবরণ নষ্ট না হয়। কোভিড পরিস্থিতির মধ্যে কিভাবে পুজোর আয়োজন করতে হবে সেই বিষয়টি পুজো উদ্যোক্তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুজো প্যাণ্ডেলে ভিড় না করা, মাস্ক ব্যবহার করা সহ একাধিক বিষয় মেনে চলার কথা পুজো উদ্যোক্তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুজোর দিনগুলির জন্য প্রশাসনের তরফে হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। স্বাস্থ্যদপ্তরও হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে। কোভিড, পুজো এবং আইন শৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত সরকারি কর্মীদের পুজোর ছুটি বাতিল করেছে প্রশাসন।

হাইকোর্টের নির্দেশ ও কোভিড বিধি মেনে পুজোর আয়োজন করতে হওয়ায় বর্ধমানের আদি অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলা মন্দিরে এবছর সধারণের প্রবেশে নিষেধাঞ্জা জারি করা হয়েছে। দেবী সর্বমঙ্গলার পুজো শুরু হয় প্রতিপদে। পুজো চলবে নবমী অর্থাৎ নবরাত্রি অবধি। রাজার আমল থেকে চলে আসা প্রথায় কোন লাগাম টানা হয়নি বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলার পুজোয়। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পুজো হচ্ছে বর্ধমানের মঙ্গলাবাড়িতে।

পূর্ব বর্ধমানের সবচেয়ে প্রাচীন আর জনপ্রিয় মন্দির দেবী সর্বমঙ্গলার। রাজা তেজচন্দের আমলে এই মন্দির নির্মাণ হয়েছিল। মন্দির ঘিরে রয়েছে অনেক উপকথা। চুনুরি বাড়ির মেয়েরা মায়ের পাষাণ প্রতিমায় গুগলি থেতো করতেন। স্বপ্নাদেশ মেনে মাকে এই প্রাচীন মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। যা পেয়েছে হেরিটেজের মর্যাদা। মন্দির সংস্কার হয়েছে। দেবী দুর্গা এখানে সর্বমঙ্গলা রূপে পুজিতা। সারাবছর বিরাজ করেন তিনি। সবকটি উৎসব রাজ-আমল থেকেই মহা সমারোহে পালিত হয়ে আসছে। আগে মহিষ ও পাঠা বলি হত। পূর্বতন জেলাশাসকের উদ্যোগে এখন বলি বন্ধ। আগে কামান ফাটানো হত সন্ধিপুজোর মহালগ্নে। ১৯৯৭-এ কামান বিস্ফোরণের পর থেকে তাও বন্ধ। তবু পুজোর পাঁচদিন এখানে তিলধারণের জায়গা থাকেনা। হাজারে হাজারে ভক্ত সমবেত হন। মাছের টক সহ নানা উপাচারে মায়ের ভোগ হয়। মালসাভোগ নিতে ভক্তরা ভিড় করেন। নবমীতে কয়েক হাজার মানুষকে বিনা শুল্কে ভোগ বিতরণ করা হয়। এবারে বেশ কয়েকমাস বন্ধ থাকার পর মন্দির খুলছে। তবে জনসমাগম খুব কম। প্রধান পুরোহিত অরুণ ভট্টাচার্য জানান, ১৭ অক্টোবর বিধি অনুসারে ঘটোত্তলন হয় রাজার প্রতিষ্ঠিত কৃষ্ণসায়রে। ঘট প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাঢ়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর আরাধনা শুরু হয়ে গিয়েছে। পুরোহিত জানান, শাস্ত্রের বিধানের পাশাপাশি তাঁরা স্বাস্থবিধির নিদান মেনে চলতে চান। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনেই সব করা হবে।