শমিদীপ দত্ত,  শিলিগুড়ি : সকাল হতেই ওরা কাঁধে করে ভাঁড়ের দুইপাশে মাটির বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ান। সময়ে সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে মুখের হাসি মিলিয়ে যাচ্ছে গৌরচন্দ্র, ললিতদের। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ক্রমশ কমছে মাটির হাঁড়ি, কলসি থেকে মাটির বিভিন্ন ধরনের সামগ্রীর চাহিদা। তবুও সংখ্যায় নগণ্য হলেও এখনও মাটির সামগ্রী ব্যবহারকারী মানুষদের খুঁজে বের করতে সারাদিন ধরে চলে তাদের হাঁক মাটির হাঁড়ি-কলসি লাগবে, মাটির হাঁড়ি-কলসি।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলাতে শুরু করেছে শহর শিলিগুড়ি। বদলাচ্ছে জীবনযাত্রার মানও। জামাকাপড় থেকে শুরু করে নিত্যপ্রযোজনীয় ব্যবহৃত সামগ্রীর বদল ঘটানোর মধ্যে দিয়ে আধুনিক হয়ে উঠছেন শহরের সাধারণ মানুষ। জল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের খাবার রাখার জন্যও এখন কোথাও মাটির ভূমিকা নেই। আর এতেই ক্রমশ বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন গৌরচন্দ্র পাল। আশিঘরের তেলিপাড়ার এই বাসিন্দা ছোটোবেলা থেকেই মাটির কলসি, হাঁড়ি থেকে মাটির সামগ্রী তৈরি করে বেরিয়ে পড়েন। বছর পঁচাত্তর ছুঁই ছুঁই হলেও এখনও শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষায় কাঁধে করে ভাঁড় নিয়ে  তিনি শহরের বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। হাঁকডাক দিলেও আগের মতো চাহিদা যে নেই তা অবশ্য রাস্তায় ধারে জিরিয়ে নেওয়ার মাঝেই গৌরবাবু বলে উঠলেন। অতীতের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, একসময়ে দিনে সবমিলিয়ে মাটির বিভিন্ন ধরনের প্রায় দশটার মতো সামগ্রী বিক্রি হত। এখন দুটোও বিক্রি হয় না। বাড়িতে শুধু বউ রয়েছে। মেয়ে বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বাড়ির চাহিদায় তাই এখনও রোজ সকালে বেরিয়ে পড়ি। গৌরচন্দ্রবাবুর মতোই রোজ ভাঁড়ে করে মাটির সামগ্রী নিয়ে ঘুরে বেড়ান চম্পাসারির বাসিন্দা অজয় দাস। তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যে বেশিরভাগ সময়ে খালি হাতেই বাড়ি ফিরি। সংসার য়ে কী করে চলে তা একমাত্র গোবিন্দই জানেন। তবে বদলাতে থাকা জীবনয়াত্রার মাঝে এখনও কিছু মানুষ মাটির সামগ্রী ব্যবহার করেন তা অবশ্য বুঝিয়ে দিলেন সুভাষপল্লির বাসিন্দা অর্পিতা রায়।  তাই এদিনের জন্য নিউ পালপাড়ার বাসিন্দা অনিল রায়কে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হল না। অনিল কাঁধ থেকে ভাঁড় নামাতেই দুপাশে থাকা মাটির হাঁড়িগুলির দরদাম করতে বসলেন অর্পিতাদেবী। প্রশ্ন করতেই বলে উঠলেন, ছোটোবেলা থেকেই বাড়িতে পুজোয় লক্ষ্মীর ধান রাখার জন্য মাটির হাঁড়ির ব্যবহার হয়ে আসতে দেখেছি। তাই এখনও ব্যবহার করি। তাঁর কথায়, আধুনিকতার যুগে নতুন জিনিসপত্রের ব্যবহার করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে প্রয়োজন অতীতের সংরক্ষণও।