জম্মু-কাশ্মীরের গ্রামে লেখাপড়া মানে জীবন সংগ্রাম

79

শ্রীনগর : প্রতিদিন বাড়ি থেকে ৩ কিলোমিটার হেঁটে আসার পর অন্তত ১ কিলোমিটার পাহাড়ে উঠতে হয় মনজুর আহমদ চককে। স্মার্ট ফোন একটা থাকলেও পাহাড় চূড়ায় না উঠলে নেটওয়ার্ক মেলে না। তাই জম্মু ও কাশ্মীরের শিক্ষা দপ্তরের লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম পোর্টালে পাঠ্যসূচি আপলোড করতে রোজ ওই চড়াই ভাঙতে হয় মনজুরকে।

মনজুর পেশায় শিক্ষক। শ্রীনগর থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে বারামুলা জেলায় ঝিলম নদীর তীরে লিম্বার গ্রামে তাঁর বাড়ি, সেখানে পাকা রাস্তা নেই, নেই ল্যান্ডফোনও। গ্রামের ৬৫০টি পরিবারের সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর যোগাযোগ হয় পাহাড়ের ওপর ওই এক টুকরো জমি থেকে। করোনা আবহে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় একমাত্র ভরসা ইন্টারনেট। কিন্তু সেই সংযোগও এত দুর্বল যে, পুরোদস্তুর অনলাইন ক্লাস করা যায় না।

- Advertisement -

মনজুরের থেকে একটু দূরে ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে পড়ুয়ারা। শিক্ষক পড়ার বিষয়বস্তু আপলোড করে দিলে তারা সেটা ডাউনলোড করে নেয়। মনজুর বলেন, শিক্ষা বরাবরই সংগ্রামের বিষয় উপত্যকায়। আমাদের সময়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য কঠিন লড়াই করতে হত। এখন সেটা করতে হচ্ছে আমাদের সন্তানদের। তিনি বলেন, এলাকাটা কেবল দুর্গম নয়, বিপজ্জনকও বটে। বাদামি ভালুক সহ নানা বন্যজন্তুর উপদ্রব। তাই বাচ্চাদের সঙ্গে অভিভাকরা আসেন এবং আলো থাকতে থাকতেই তাঁরা গ্রামে ফিরে যান। মনজুর বলেন, এমন পাণ্ডববর্জিত দেশে থাকবে কে! সন্তানদের পড়াশোনার জন্যই প্রতি বছর গড়ে অন্তত ২০ শতাংশ বাসিন্দা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।

অবস্থা এমনই যে সেখানে মনজুর ছাড়া আর কোনও শিক্ষক নেই। মাধ্যমিক পর্যন্ত এভাবেই চলে। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক পড়তে হলে সকলকেই জেলা সদরে যেতে হয়। কেউ বাড়ি থেকে বারমুলার কলেজে পড়তে চাইলে দিনে খরচ অন্তত ২৫০ টাকা, যা প্রায় কারও পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয়। বাইরে পড়তে গেলে আবার ভাষা ছাড়াও নানা সমস্যা থাকে। আকিব হাফিজ বিটেক পড়তে হরিয়ানার কুরুক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে রীতিমতো সমস্যায় পড়েছিলেন। সহপাঠীদের সঙ্গে মেলামেশা, প্রযুক্তি পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত নানা যন্ত্রপাতি সম্পর্কে অজ্ঞতা। অনলাইন পরীক্ষার সময় অবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ পেতে বারামুলায় তাঁকে মাসিক ২ হাজার টাকা দিয়ে ঘর ভাড়া নিতে হয়েছিল। সেটা না করলে কী কাণ্ড হয়, সেটা জানা গেল রউফ মোল্লার অভিজ্ঞতা থেকে। উচ্চমাধ্যমিক পাশ রউফ বলেন, একটা ক্লাসের পড়া ডাউনলোড করতে তাঁর চার দিন সময় লেগেছিল। ১৪ বছরের কিশোর আরভিনের ইচ্ছা আইএএস হওয়ার। কিন্তু সুব্যবস্থার অভাবে অন্য রাজ্যের পড়ুয়াদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ কঠিন।

লিম্বারের অনেক বাসিন্দাই জানালেন, ইন্টারনেট না থাকায় অনেকেই টিকাকরণে নাম লেখাতে পারেননি। ইন্টারনেট না থাকায় অনেকে টিকা নিলেও তার শংসাপত্র নেই, বললেন গ্রামের বাসিন্দা মহম্মদ হামিদ খান। লিম্বারের মতো এমন অন্তত শ-দেড়েক গ্রাম আছে জম্মু-কাশ্মীরে, যেখানকার বাসিন্দারা আজও মূল ভখণ্ড থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন। যদিও এসব শুনে আকাশ থেকে পড়লেন বারামুলার ডেপুটি কমিশনার ভূপিন্দর কুমার। তিনি বলেন, সে কী! কী কাণ্ড! আগে বলেনি কেন ওরা? এমন তো হওয়ার কথা নয়! ঠিক আছে, আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি। কমিশনারের কথা শুনে মুখ টিপে হাসলেন মনজুর। এই নাটকটা যে কতবার দেখতে হয়েছে তাঁকে। বহুবার লিখিতভাবে বলেও কোনও সুরাহা হয়নি লিম্বার বাসিন্দাদের। তাঁরা থেকে গিয়েছেন সেই তিমিরেই।